বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আধিপত্যবাদের সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে জনসাধারণ ও রাষ্ট্রকে সচেতন করার অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করল ‘আধিপত্যবাদবিরোধী নাগরিক সমাজ’ নামের একটি নতুন নাগরিক জোট। আজ সোমবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্ল্যাটফর্মটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র উন্মোচন করা হয় এবং পরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
নবগঠিত প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় তিনি জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বদলে যাওয়া আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ইস্যুতে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। স্বাধীনতা, জাতীয় মর্যাদা, গণতান্ত্রিক আত্মশাসন এবং শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের এই প্ল্যাটফর্মে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, আধিপত্যবাদের ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণ ও রাষ্ট্রকে সচেতন করা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সম্মিলিত প্রচেষ্টা গড়ে তোলাই এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ‘নতুন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্ব কৌশল’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী।
আলোচনায় অংশ নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলম মন্তব্য করেন, জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন শুধু শেখ হাসিনা ও তার দলের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধেই ছিল না, বরং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও ছিল। তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া অব্যাহত রাখলে বাংলাদেশ সম্পর্কে দেশটির আধিপত্যবাদী অবস্থান যে পরিবর্তিত হয়নি, তা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম তার বক্তব্যে দেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে নিজস্ব ড্রোন তৈরির প্রযুক্তি গড়ে তোলা এবং ‘চিকেন নেক’–কেন্দ্রিক সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য অন্য কোনো দেশে আক্রমণ নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। একই সঙ্গে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর থেকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে নিহত ফেলানীর ভাস্কর্য অপসারণের ঘটনার সমালোচনাও করেন তিনি।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ও ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম আলোচনায় বলেন, খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মতো মৌলিক চাহিদার বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হলে দেশের সার্বভৌমত্ব সব সময়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য যেভাবে সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করেছিল, বর্তমানেও লুটপাট ও অর্থনৈতিক বৈষম্য টিকিয়ে রাখতে আধিপত্যবাদের রূপ ও ধরন পরিবর্তিত হয়েছে, তবে এর মূল চরিত্র অপরিবর্তিত রয়েছে।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (সংরক্ষিত আসন) মারদিয়া মমতাজ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসির। অনুষ্ঠানের সমাপনী অংশে প্ল্যাটফর্মটির সাত সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—অধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসির, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এ কে এম ফাহিম মাসরুর, সাবেক কূটনীতিক সাকীব আলী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা খান মুখলেছুর রহমান ও অ্যাক্টিভিস্ট মিনহাজুল আবেদীন।




