ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত দুই দেশের স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার যেকোনো উদ্যোগ বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সোমবার দিবাগত রাত ১টা ৫ মিনিটে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দেওয়া এক পোস্টে এই অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি।

এনসিপি প্রধান তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, বিগত দুই বছর ধরে ভারত তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিয়ে আসছে। তাঁর মতে, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, বিচারব্যবস্থা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি ঢাকার আপত্তি উপেক্ষা করে দিল্লিতে হাসিনার কথিত সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ভারতের আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী নীতিতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ভারতের কাছ থেকে কোনো কার্যকর জবাবদিহি আদায় করতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, শুধুমাত্র একটি বিবৃতি প্রকাশের মাধ্যমেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে বলে মনে হচ্ছে। সার্বভৌমত্বের ওপর এমন গুরুতর আঘাতের পরেও ভারত সরকারের কাছ থেকে কোনো কার্যকর জবাবদিহিতা না পাওয়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

উদ্বেগের আরেকটি কারণ হিসেবে নাহিদ ইসলাম উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও ৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, ব্যাখ্যা বা দুঃখ প্রকাশের তথ্য গণমাধ্যমে আসেনি। জনগণের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি উচ্চপর্যায়ের ওই বৈঠকে যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়াকে তিনি গভীরভাবে হতাশাজনক বলেও অভিহিত করেন।

ভারতীয় হাইকমিশনারের 'শেয়ার্ড ড্রিম' প্রসঙ্গে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, বাংলাদেশের জনগণ কোনো সম্প্রসারণবাদী 'শেয়ার্ড ড্রিমে'র অংশীদার হতে রাজি নয়। দিল্লি যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা প্রভাব বিস্তারের অধিকার দাবি করে, তবে এমন সম্পর্ক মেনে নেবে না দেশের মানুষ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া দ্রুততর করবে এবং বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিশালী দক্ষিণ এশিয়া দেখতে চায়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদকে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপে রূপান্তর করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর ভাষ্যমতে, ৫ আগস্টের ঘটনায় ভারতের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও দুঃখ প্রকাশ, শেখ হাসিনা ও ওসমান হাদির খুনিদের প্রত্যর্পণ এবং ভারতের মাটি থেকে বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধের নিশ্চয়তা—এই তিনটি বিষয়ে সরকারের দৃঢ় ও দৃশ্যমান অবস্থান প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ যদি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা চালাতে পারে, তাহলে সেই সময়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের ভারত সফর করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া অর্থহীন। বন্ধুত্বের অজুহাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতার অবসান, পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয় ও কার্যক্রম প্রসঙ্গে ভারতের সুস্পষ্ট অবস্থান এবং সাম্প্রতিক সব ঘটনার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে—এমনটিই জানান এনসিপির আহ্বায়ক।