আজ ২২ আগস্ট বিশ্বখ্যাত পপ গায়িকা ডুয়া লিপার ৩১তম জন্মদিন। লন্ডনে জন্ম নেওয়া এই তারকার জীবন এখন শুধু গানের মঞ্চেই সীমাবদ্ধ নেই; সাম্প্রতিক ‘সানডে টাইমস রিচ লিস্ট’ অনুযায়ী তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ১৫ কোটি পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৯ কোটি ও ২০২৫ সালের ১১ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড থেকে ২০২৬ সালে এই অঙ্ক লাফিয়ে বেড়েছে। এই তালিকায় কেটি পেরির পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন তিনি; বিশ্লেষকদের নজর এখন টেলর সুইফটের দিকেও। গানের আয়, বিশ্বভ্রমণ ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে এই দ্রুত উত্থান।
চলতি বছরের ৩১ মে লন্ডনের ওল্ড মেরিলিবোন টাউন হলে ঘনিষ্ঠ পরিসরে ব্রিটিশ অভিনেতা ক্যালাম টার্নারের সঙ্গে তাঁর বেসামরিক বিবাহ সম্পন্ন হয়। পরে ইতালির সিসিলিতে বড় আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসব পালিত হয়। ২০২৫ সালে বাগ্দানের সময় ক্যালাম বিশেষভাবে তৈরি আংটি উপহার দেন এবং ডুয়ার বোন রিনাসহ ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মতামত নেন। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে ক্যালাম জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে পরিবার গড়ার ইচ্ছা তাঁর অন্যতম অগ্রাধিকার। ডুয়া লিপাও সন্তান নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যদিও পেশাগত ব্যস্ততার সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের সময় মেলানোর বিষয়ে সচেতন।
২০২৪ সালে প্রকাশিত তৃতীয় স্টুডিও অ্যালবাম ‘র্যাডিক্যাল অপটিমিজম’ ও পরবর্তী বিশ্বভ্রমণ তাঁর আয়ের বড় উৎস। ৮১টি শো থেকে প্রায় ১৪ কোটি ১০ লাখ ডলার আয় হয়েছে বলে হিসাব পাওয়া যায়; কেবল লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে দুটি রাতের অনুষ্ঠান থেকেই প্রায় ২ কোটি ডলার অর্জিত হয়। ফোর্বসের তালিকায় ২০২৫ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পীদের মধ্যে ছিলেন তিনি, ওই বছর তাঁর আয় আনুমানিক ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এর আগে ২০২০ সালের ‘ফিউচার নস্টালজিয়া’ অ্যালবামটি ডিস্কো ও আধুনিক পপের মিশেলে তাঁর ক্যারিয়ারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ‘ডোন্ট স্টার্ট নাউ’, ‘ফিজিক্যাল’, ‘লিভিটেটিং’ ও ‘ব্রেক মাই হার্ট’—এই গানগুলো দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক চার্টে শীর্ষস্থান ধরে রাখে। করোনাকালে তাঁর নৃত্যধর্মী গান অনেকের বিনোদনের উৎস হয়ে ওঠে। এই সাফল্যের জন্য তাঁর ঝুলিতে এখন তিনটি গ্র্যামি ও সাতটি ব্রিট অ্যাওয়ার্ড রয়েছে।
গানের পাশাপাশি চলচ্চিত্র ও ফ্যাশনের জগতে নিজের উপস্থিতি জানান দেন ডুয়া। ‘বার্বি’ সিনেমার জন্য গাওয়া ‘ড্যান্স দ্য নাইট’ নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে তোলে। এরপর অভিনয়ের জগতেও পা রাখেন তিনি। শুধু গানের পারিশ্রমিক নয়, নিজের ব্র্যান্ড ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করেন এই শিল্পী।
ক্যারিয়ারের শুরুর গল্প অবশ্য সহজ ছিল না। ২০১৩ সালে ‘দ্য এক্স ফ্যাক্টর’–এর একটি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ পান। ২০১৪ সালে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। ২০১৭ সালে প্রকাশিত প্রথম অ্যালবাম ‘ডুয়া লিপা’–র ‘বি দ্য ওয়ান’ গান তাঁকে দ্রুত আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেয়। অথচ প্রকৃত মোড় ঘুরিয়ে দেয় ২০১৮ সালের ‘নিউ রুলস’। বিচ্ছেদের পর আত্মনির্ভরতার বার্তা বহনকারী এই গান তরুণ প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসের সংগীতে পরিণত হয় এবং তাঁকে সম্ভাবনাময় গায়িকা থেকে আন্তর্জাতিক তারকায় রূপান্তরিত করে।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৯৫ সালের ২২ আগস্ট লন্ডনে জন্ম নেন ডুয়া। তাঁর বাবা দুজাগিন লিপা ও মা আনেসা কসোভোর প্রিস্টিনার বাসিন্দা। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে কসোভোর সংঘাতের সময় তাঁরা লন্ডনে আশ্রয় নেন। বাবা ডেন্টিস্ট্রি ও মা আইন বিষয়ে পড়াশোনা করলেও শরণার্থী হিসেবে নতুন দেশে রেস্তোরাঁয় কাজ করতে হয় দুজনকেই। ডুয়ার শৈশব তাই লন্ডনের বহুজাতিক পরিবেশের পাশাপাশি কসোভোর স্মৃতি ও পরিবারের সংগ্রামের গল্প শুনে কাটে। বাবাও একসময় কসোভোর একটি রক ব্যান্ডে গান করতেন; ফলে বাড়িতে সংগীত ছিল নিত্যসঙ্গী।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে গান গাওয়া শুরু করেন লিপা। অথচ স্কুলের গানের দলে অডিশনে একবার বলা হয়, তিনি নাকি গান গাইতে পারেন না। এই প্রত্যাখ্যান তাঁকে থামায়নি; বরং আগ্রহ আরও বাড়ে। পরে সিলভিয়া ইয়াং থিয়েটার স্কুলে প্রশিক্ষণ নেন। ২০০৬ সালে ১১ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে কসোভোয় ফিরে যান। নতুন স্কুলে ভর্তি হলেও লন্ডনে বড় হওয়ায় আলবেনীয় ভাষায় দক্ষতা কম ছিল; ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। তখনই তিনি বুঝতে শুরু করেন, সংগীত নিছক শখ নয়—ভবিষ্যৎ।
আন্তর্জাতিক পপ তারকা হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কসোভোর পরিবেশ যথেষ্ট মনে হয়নি। তাই মাত্র ১৫ বছর বয়সে একা লন্ডনে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের সদস্যরা তখন কসোভোয়। পরিচিত একজনের সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করে নতুন জীবন শুরু করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার—সবকিছুই নিজেকে সামলাতে হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি বলেছেন, এত অল্প বয়সে একা থাকার অভিজ্ঞতা তাঁকে দ্রুত পরিণত করে তুলেছিল। তখন তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই—গানকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ইউটিউব ও সাউন্ডক্লাউডে নিজের গান ও জনপ্রিয় গানের কাভার প্রকাশ করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর ভারী ও খানিকটা কর্কশ স্বরের বিশেষত্ব শ্রোতাদের নজর কাড়ে। মডেলিংও করেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর ক্যারিয়ারের মতোই আলোচিত। ২০১৯ সালে সম্পর্ক গড়েন মডেল আনোয়ার হাদিদের সঙ্গে, যিনি সুপারমডেল জিজি ও বেলা হাদিদের ভাই। প্রায় আড়াই বছর পর ২০২১ সালের শেষ দিকে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। এরপর ২০২৩ সালে ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক রোমাঁ গাভ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। কান চলচ্চিত্র উৎসবসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে দেখা গেলেও সেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের শুরুতে ব্রিটিশ অভিনেতা ক্যালাম টার্নারের সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জন শুরু হয়, যা সময়ের সঙ্গে প্রকাশ্য রূপ নেয় এবং অবশেষে বিয়েতে পরিণত হয়।
গানের বাইরে আরেকটি কারণে বারবার আলোচনায় আসেন ডুয়া লিপা—ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য সমর্থন। কসোভো যুদ্ধের সময় তাঁর মা–বাবার বাস্তুচ্যুতির অভিজ্ঞতা তাঁর অবস্থানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৪ সালে ‘রোলিং স্টোন’–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে ঘর ছাড়ার কষ্ট তাঁর পরিবারের রয়েছে; তাই এটি তাঁর কাছে দূরের কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়। বিলবোর্ড, ভোগ ও রোলিং স্টোন অবলম্বনে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তিনি ইসরায়েলি প্রাণহানির জন্য শোক প্রকাশ করেন এবং গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুতেও উদ্বেগ জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল—এক পক্ষের শোক প্রকাশ করলে অন্য পক্ষের মৃত্যুকে উপেক্ষা করা যায় না। ২০২৪ সালের শুরুতে তিনি গাজায় মানবিক যুদ্ধবিরতির দাবি জানান। ‘আর্টিস্ট ফর সিজফায়ার’–এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনা প্রশমনের দাবিতে খোলা চিঠি পাঠান, যেখানে জিম্মিদের মুক্তির দাবিও ছিল।
যে মেয়েটি ১৫ বছর বয়সে একা লন্ডনে ফিরে এসে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার লড়াই শুরু করেছিলেন, তিনি আজ সেই শহরেই নিজের সংসার গড়েছেন এবং বিশ্বের মঞ্চে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করেছেন। শরণার্থীর মেয়ে থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার মালিক—ডুয়া লিপার এই যাত্রা আধুনিক পপ সংস্কৃতির এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে।




