জুলাইয়ের শেষ দিকে ডাচেস অব সাসেক্সের জীবনধারা ব্র্যান্ড ‘অ্যাজ এভার’ একটি ‘সমৃদ্ধ, প্রাণবন্ত’ ব্ল্যাকবেরি স্প্রেড বাজারে এনেছিল; সঙ্গে ছিল ফল তোলার একটি নরম আলোর ভিডিও। এর ঠিক এক মাস পরই মেগান ও প্রিন্স হ্যারি যুক্তরাজ্যে বসবাসের জন্য ফিরছেন, যদিও ব্ল্যাকবেরির মৌসুম ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রত্যাবর্তন ব্র্যান্ডের জন্য নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
রাজপরিবার থেকে ২০২০ সালে বিতর্কিতভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পর এই দম্পতি ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন জীবন গড়ে তোলেন। স্ট্রিমিং, স্বাক্ষরিত সুগন্ধি ও অন্যান্য প্রকল্প—সবকিছুতেই বড় দর্শক বা ক্রেতা আকর্ষণে ব্যর্থতার মুখ দেখেছে। এখন তাদের পরবর্তী গন্তব্য কী—সেটি স্পষ্ট নয়।
ফেরার খবরে অনেকে বিস্মিত। যদিও তারা কর্মরত রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে ফিরছেন না, তবুও নতুন ভূমিকায় কী করবেন—তা নিয়ে জল্পনা চলছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইদ বিজনেস স্কুলের ল’রিয়েল অধ্যাপক অ্যান্ড্রু স্টিফেনের বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর সাসেক্সরা প্রথমে ‘বিপুল মনোযোগ আকর্ষণ করেন এবং সেটিকে নগদে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হন।’ কিন্তু তিনি যোগ করেন, ‘আমি মনে করি না, তারা সেই প্রাথমিক সাফল্যকে একটি স্থায়ী ব্র্যান্ডে পরিণত করতে পেরেছেন।’
বর্তমানে তাদের কার্যক্রম সামাজিক প্রভাব, বিনোদন ও জীবনধারা—এই তিনটি ভিন্ন খাতে ছড়িয়ে রয়েছে। স্টিফেনের ভাষায়, এটি একটি ‘বিভক্ত পোর্টফোলিও’, যা ব্র্যান্ডের প্রকৃত পরিচয়কে অস্পষ্ট করে তুলেছে।
রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর দম্পতিটি আর্থিক স্বাবলম্বিতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রথমে রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়ে শুরু করে পরে মিডিয়া প্রযোজনা ও জীবনধারার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এখন মেগানের প্রধান মনোযোগ ‘অ্যাজ এভার’-এর দিকে।
তাদের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আর্কওয়েল প্রোডাকশনস’-এর লক্ষ্য ‘আমাদের সাধারণ মানবিকতা তুলে ধরা ও সম্প্রদায়ের উদযাপন’। ‘ইনভিক্টাস গেমস’ প্রচার ও ‘আর্কওয়েল ফিলানথ্রপিজ’-এর মাধ্যমে দাতব্য কাজ অব্যাহত রয়েছে।
২০২০ সালে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে প্রায় ১০ কোটি ডলার এবং স্পটিফাইয়ের সঙ্গে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের চুক্তি হয়। নেটফ্লিক্সের পাঁচ বছরের চুক্তিতে পাঁচটি অনুষ্ঠান তৈরি হয়—‘হ্যারি অ্যান্ড মেগান’, ‘উইথ লাভ, মেগান’-এর দুটি সিরিজসহ। কিন্তু স্ট্রিমিং সংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। গত বছর চুক্তি বদলে প্রথম দেখার সুযোগের ব্যবস্থায় পরিণত হয়। চলতি বছরে মাত্র একটি নতুন প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে।
স্পটিফাইয়ের সঙ্গে ২০২৩ সালে ‘পারস্পরিক সম্মতিতে’ সম্পর্ক শেষ হয়। মেগানের ১২ পর্বের পডকাস্ট ‘আর্কিটাইপস’ দ্বিতীয় সিরিজের জন্য নবায়ন হয়নি।
যুক্তরাজ্যে ফেরার ফলে একটি নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। স্টিফেনের মতে, ‘এটি তাদের ব্রিটিশ রাজজীবনের কেন্দ্রে এনে সাংস্কৃতিকভাবে আরও প্রাসঙ্গিক করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের স্বতন্ত্রতার ওপর রাজপরিবারের নির্ভরশীলতা আরও জোরদার হবে। ফলে স্বাধীন, আমেরিকান-ধাঁচের সেলিব্রিটি ও জীবনধারা ব্র্যান্ড গড়ার চেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
ব্র্যান্ড বিশেষজ্ঞ সুজান ফুর্নিয়ার—যিনি হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন—বলছেন, বারবার প্রকল্প বদলানোর ঝুঁকি রয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই দম্পতি রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি থেকে সমালোচকে, তারপর মিডিয়া প্রযোজক থেকে—মেগানের ক্ষেত্রে—জীবনধারা প্রভাবকে পরিণত হয়েছেন। ‘প্রতিবার একটি ব্র্যান্ড ১৮০ ডিগ্রি ঘোরালে, তা আর ফিরে আসে না,’ তিনি বলেন। সফল ব্র্যান্ডগুলো ধারাবাহিক চিত্র বজায় রাখে; যুক্তরাজ্যে ফেরাকে আরেকটি ইউ-টার্ন হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সমাধান হিসেবে স্টিফেন পরামর্শ দেন, ‘একটি সুসংহত পোর্টফোলিও—কেন্দ্রীভূত ব্যবসা ও বিশ্বাসযোগ্য কারণের দিকে’ মনোযোগ দেওয়া উচিত।
অন্যান্য আয়ের উৎসের মধ্যে রয়েছে উত্তরাধিকার ও হ্যারি স্মৃতিকথা ‘স্পেয়ার’-এর বিক্রি। ১৯৯৮ সালের পর যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত অ-কাল্পনিক বইয়ের মধ্যে এটি দ্রুততম বিক্রিত। মেগানের অভিনয়ে ফেরার সম্ভাবনাও উঁকি দিচ্ছে।
বিবিসি জানতে পেরেছে, তিনি নেটফ্লিক্স সিরিজ ‘দ্য জেন্টলমেন’-এ একটি ভূমিকার জন্য আলোচনায় রয়েছেন। গাই রিচি নির্মিত এই কমেডি সিরিজে একজন ডিউক মাদক ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার কাহিনি রয়েছে। বিস্তারিত প্রকাশিত হয়নি; তবে এটি মেগানের বিবাহ-পরবর্তী প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অভিনয়ের সুযোগ হতে পারে।
‘অ্যাজ এভার’ ২০২৪ সাল থেকে জ্যাম, চা, মোমবাতি ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি করছে—যেগুলো ‘প্রতিদিনকে উন্নত ও আনন্দের মুহূর্ত অনুপ্রাণিত করতে’ তৈরি। মার্চে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে অংশীদারিত্ব শেষ হলেও, আটলান্টিক পাড়ি দিয়েও এই পণ্যশ্রেণি বন্ধ হওয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই।
একটি সম্ভাব্য সুযোগ হতে পারে কটসওল্ডসে তাদের কথিত স্থানান্তর। আমেরিকান স্টাইলিস্ট ও সৃজনশীল পরিচালক লরা স্টলোফ—যিনি লন্ডন ও কটসওল্ডসে বসবাস করেন—বলেন, মেগানের ব্র্যান্ড ও ইংরেজ গ্রামীণ জীবনের মধ্যে ‘একটি স্বাভাবিক সংযোগ’ রয়েছে। তিনি মনে করেন, এটি ব্র্যান্ডকে আরও স্বতন্ত্র করতে পারে, কারণ আমেরিকায় ইংরেজ গ্রামীণ জীবনের প্রতি আকর্ষণ এখনো প্রবল।
তবে স্টিফেনের সতর্কতা—‘যুক্তরাজ্যে ফেরা একটি কার্যকর ব্র্যান্ড পুনর্গঠন হতে পারে, কিন্তু একটি পোস্টকোড ব্র্যান্ডের অবস্থান বদলে না। আচরণই বদলায়।’ উল্লেখ্য, ২০২০ সালের মার্চে রাজকীয় দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে এই দম্পতি ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাস করছেন।




