আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) উপ-প্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামিম খান বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সুদানের ডারফুর অঞ্চলে সম্প্রতি সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের ঘটনায় র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ‘কংক্রিট প্রমাণ’ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, এখন তদন্তে স্থলপর্যায়ের ঘটনার সঙ্গে নেতৃত্বস্থানীয় নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের প্রমাণ মিলেছে। খানের দাবি, এল-ফাশার ও এল-জেনিনা শহরে বেসামরিক নাগরিকদের ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইসিসি যুগান্তকারী অগ্রগতি অর্জন করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সময় লাগতে পারে ঠিক, তবে আদালত একদিন তার লক্ষ্যে পৌঁছাবে।
গত বছরের অক্টোবরে আরএসএফ বাহিনী এল-ফাশার দখলের পর সেটি সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে চলমান যুদ্ধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় ছয় হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। একই ধরনের হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এল-জেনিনা শহরকেও ঘিরে রয়েছে। তবে আরএসএফ বারবার ডারফুরের কোথাও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ সংঘটনের কথা অস্বীকার করে আসছে।
এদিকে বুধবার প্রকাশিত এক জাতিসংঘ ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে সুদানের সংঘাতে সেনাবাহিনী ও আরএসএফ উভয়পক্ষের দ্বারা সংঘটিত ব্যাপক নৃশংসতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডারফুরে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অধিকাংশ সুপরিকল্পিত হামলার জন্য আরএসএফ যোদ্ধারা দায়ী। বিশেষ করে জাতিগত ভিত্তিতে মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের আওতায় পড়ে। গত বছর এল-ফাশার দখলের সময় আরএসএফ যোদ্ধা ও তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলো ধর্ষণ, দলগত ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব এবং অন্যান্য যৌন নির্যাতন চালিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরএসএফ ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের অভিযোগ নাকচ করে জানিয়েছে, নৃশংসতার মাত্রা অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। তবে শহরে কিছু লঙ্ঘন ঘটেছে বলে তারা স্বীকার করেছে। এল-ফাশার দখলের পরপরই আরএসএফ নেতা জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো বলেছিলেন, যেকোনো নৃশংসতার ঘটনা তারা নিজেরাই তদন্ত করছে। সম্প্রতি আরএসএফ জানিয়েছে, এ তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার রাষ্ট্রদূত এলিনর স্যান্ডার্স সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, এল-ওবেইদ শহর গত বছর এল-ফাশারে দেখা নৃশংসতার মতো একই পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল ইতিমধ্যে এল-ওবেইদে সংঘটিত অভিযোগ অনুসন্ধানে জরুরি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
ডারফুর অঞ্চলে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে তদন্ত করছে আইসিসি। ২০০০-এর দশকের সহিংসতার সময় প্রথম এ বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়। খান বিবিসিকে বলেন, বর্তমানে ‘অপরাধের যে ধারা’ দেখা যাচ্ছে, তা ২০ বছর আগের ধারার মতোই। আইসিসির তদন্তে সাক্ষীদের বিবৃতি, ভিডিও, ছবি ও ফরেনসিক প্রমাণের মতো সহায়ক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে।
পূর্ববর্তী তদন্তে সাতজনকে গ্রেপ্তার এবং ছয়টি পৃথক মামলা আদালতে এসেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির। তিনি ২০১৯ সালের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এখনও পলাতক রয়েছেন। ধারণা করা হয়, তাকে সুদানের একটি নিরাপদ চিকিৎসা কেন্দ্রে আটক রাখা হয়েছে। আরও চারজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকলেও তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। গত বছর আইসিসি ডারফুরে ২০০৩ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে সংঘটিত ২৭টি যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য জানজাউইদ গোষ্ঠীর সাবেক শীর্ষ ব্যক্তি আলী মুহাম্মদ আলী আবদ-আল-রহমানকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। জানজাউইদ পরবর্তীকালে আরএসএফ-এ রূপান্তরিত হয়, যা একসময় সুদানের সেনাবাহিনীর মিত্র থাকলেও বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।




