যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার কারণে বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল কার্যত থমকে গেছে। এর ফলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকটের মুখে থাকা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নতুন করে চাপের সম্মুখীন হয়েছে। জাহাজ চলাচলের তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স বৃহস্পতিবার জানায়, গত মঙ্গলবার থেকে কোনো বড় বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের অবস্থান জানিয়ে এই প্রণালি অতিক্রম করেনি। এই জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাইয়ের পর থেকে ১০ হাজার ডিডব্লিউটির (ডেডওয়েট টন) বেশি সক্ষমতার কোনো জাহাজ তাদের অবস্থান শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) সক্রিয় রেখে 'সাউদার্ন হাইওয়ে' নামে পরিচিত রুটটি ব্যবহার করেনি। তবে অন্তত দুটি জাহাজ নিজেদের শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রেখে পথটি পার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আঞ্চলিক এই উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা সত্ত্বেও শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অনেকটাই স্থিতিশীল ছিল, যদিও এর আগে কয়েক দিন ধরে দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্ল্যাটফর্ম উইন্ডওয়ার্ড বুধবার জানিয়েছে, গত সোমবার যেখানে ৪৫টি জাহাজ এই প্রণালি পার হয়েছিল, সেখানে বুধবার এবং বৃহস্পতিবার ভোরে মাত্র ৫টি জাহাজের পারাপারের রেকর্ড পাওয়া গেছে। অথচ গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করত। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) বলেছে, বর্তমান উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে জাহাজ চলাচলের ওপর।

জাপানের ইয়োকাশুকা কাউন্সিল অন এশিয়া প্যাসিফিক স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক জন ব্র্যাডফোর্ড আল-জাজিরাকে বলেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—মধ্যপ্রাচ্যে লম্বা সময় ধরে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি এড়িয়ে অন্য বন্দর ও পথ ব্যবহারের স্থায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে জাহাজ পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলো। গত মঙ্গল ও বুধবার ইরানের ডজনখানেক লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলার পর, বৃহস্পতিবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, এই হামলার পেছনে মার্কিন বাহিনী জড়িত ছিল না। এখন পর্যন্ত কোনো দেশ বা গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে ইরানি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমগুলো জানায়, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে একাধিক হামলার জবাবে ওয়াশিংটন যে হামলা চালিয়েছিল, তার পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে তেহরানের বাহিনী বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান এবং ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধের হুমকি দিয়েছে। আঞ্চলিক এই উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা সত্ত্বেও শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৭৬ ডলার ৩৭ সেন্টে দাঁড়িয়েছে, যা গতকালের দামের প্রায় সমান এবং গত বুধবারের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ কম।