যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া রাজ্যে শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে কর্তৃপক্ষ। সরকারি স্কুলগুলিতে পুরো স্কুল সময় জুড়ে মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা বা নির্দিষ্ট স্থানে জমা রাখার একটি আইন পাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের সেনেট এবং হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস এই সংক্রান্ত পৃথক বিল পাস করেছে, এবং গভর্নর জোশ শাপিরো চূড়ান্ত সংস্করণে সম্মতি দিয়ে আইনে স্বাক্ষর করতে আগ্রহী। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো ক্লাসরুমে ডিজিটাল বিক্ষিপ্ততা কমানো, শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগ বাড়ানো, প্রত্যক্ষ সামাজিক মিথস্ক্রিয়া তৈরি করা এবং স্কুল চলাকালীন সামাজিক মাধ্যমে সংঘাত হ্রাস করা।
ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের নার্সিং অধ্যাপক এবং ফরেনসিক নার্স এলিজাবেথ ডাউডেল, যিনি শিশুদের ইন্টারনেট নিরাপত্তা ও সাইবার আগ্রাসন নিয়ে গবেষণা করেন, তিনি এই নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে, নতুন নিয়ম অনুসরণ করা সকল শিক্ষার্থীর জন্য সহজ হবে না। যারা তাদের ফোনের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, তাদের জন্য মানিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা দৈনিক গড়ে প্রায় ৮.৫ ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে কাটায়। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্মার্টফোন ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, বুলিং এবং শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জের সাথে যুক্ত। 'প্রব্লেমেটিক স্মার্টফোন ইউজ' (পিএসইউ) নামে পরিচিত একটি আচরণগত প্যাটার্নও শনাক্ত হয়েছে, যা বিষণ্নতা, চাপ এবং একাডেমিক কর্মক্ষমতা হ্রাসের সাথে সম্পর্কিত। এই সমস্যায় ভুগছেন এমন শিক্ষার্থীদের ফোন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা হয়, তারা নোটিফিকেশন নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে এবং ফোন থেকে বিচ্ছিন্ন হলে মানসিক চাপ অনুভব করে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৩ সালের এক জরিপের তথ্য বলছে, এই বয়সীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ৪৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরী জানিয়েছে যে তাদের ফোন না থাকলে তারা উদ্বিগ্ন বোধ করে। অন্যদিকে, ৭২ শতাংশ জানিয়েছে যে তারা ফোন ছাড়া শান্তি অনুভব করে। পেনসিলভানিয়ার নিষেধাজ্ঞার সমর্থকরা যুক্তি দেন যে শিক্ষার্থীদের ক্রমাগত নোটিফিকেশন থেকে বিরতি প্রয়োজন, যাতে তারা শেখা ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশে মনোযোগ দিতে পারে। গবেষকরা একে 'ডিজিটাল ডিটক্স' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ডাউডেলের মতে, পিএসইউ-তে আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা এই নিষেধাজ্ঞায় প্রথম দিকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। প্রথম কয়েক সপ্তাহে তাদের মধ্যে উদ্বেগ, বিরক্তি বা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে এবং একাডেমিক ও আচরণগত ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তবে স্কুল নীতি গবেষণার প্রমাণ দেখায় যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চ্যালেঞ্জগুলি স্থিতিশীল হয়। কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে শিক্ষার্থীরা নতুন রুটিনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়। তবে কিছু শিক্ষার্থী নিয়ম ভাঙতে, ফোন লুকিয়ে রাখতে বা স্মার্টওয়াচের মতো বিকল্প ডিভাইস ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে।
শিশুর বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রভাব নিয়েও আলোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স সুপারিশ করে যে ১৮ মাসের কম বয়সী শিশুদের জন্য স্ক্রিন ব্যবহার এড়ানো উচিত (ভিডিও কল ব্যতীত), এবং ২ থেকে ৫ বছর বয়সীদের জন্য দিনে এক ঘণ্টার বেশি শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান না দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ৬ থেকে ১১ বছর বয়সীরা সামাজিক দক্ষতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি করছে, তাই এই বয়সে ফোন ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। পঞ্চম শ্রেণির মধ্যে অনেকের নিজস্ব ফোন থাকে। মিডল স্কুলে পরিচয় গঠন ও পিয়ার গ্রুপের প্রভাব ফোন ব্যবহারকে আরও জোরালো করে তোলে। হাই স্কুলে ডিজিটাল জীবন আরও জটিল হয়। নিষেধাজ্ঞা সামাজিক মাধ্যমের চাপ ও ক্লাসরুমের বিভ্রান্তি কমাতে পারে, তবে কিশোর-কিশোরীরা এটিকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখতে পারে।
অনেক রাজ্যে ইতিমধ্যে স্কুলে ফোন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এবং আরও ২৫টি রাজ্য শিক্ষার সময় ফোন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে। এই সকল নীতিতে অনুবাদ পরিষেবা, ডকুমেন্টেড চিকিৎসা প্রয়োজন এবং অনুমোদিত শিক্ষামূলক অ্যাক্সেসের জন্য ছাড় দেওয়া হয়। পেনসিলভানিয়ার আইন পাস হলে পিতামাতার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে পিতামাতারা শিশুদের সুস্থ ফোন অভ্যাস গঠনে সাহায্য করতে পারেন: ফোন বেডরুমের বাইরে চার্জ করা, নির্দিষ্ট সময়ে ওয়াই-ফাই বা অ্যাপ বন্ধ রাখা, ঘুমানোর আগে ও পরে ফোন ব্যবহার না করা, হোমওয়ার্ক ও খাবারের সময় ফোন না রাখা, এবং ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট ও মাইনক্রাফটের মতো জনপ্রিয় অ্যাপে সময় সীমিত করতে বিল্ট-ইন ফিচার ব্যবহার করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পিতামাতাদের নিজেদেরও সুস্থ ডিজিটাল আচরণ মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত।


