বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, ছোট আকারের কৃষকদের জন্য গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন এখন আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। এই খাত থেকে তাদের আয় ধান ও সবজির মতো অস্থায়ী ফসল থেকে আসা আয়ের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, একজন ক্ষুদ্র কৃষক বছরে গড়ে প্রাণিসম্পদ থেকে ২৮ হাজার ৪২১ টাকা আয় করেন, অন্যদিকে অস্থায়ী ফসল থেকে আয় মাত্র ৪ হাজার ৫৯১ টাকা। ফলদ ও স্থায়ী ফসল থেকে আয় আরও কম, ২ হাজার ৩৩১ টাকা, তবে বনজ সম্পদ থেকে ১০ হাজার ৮৯২ টাকা এবং মাছ চাষ থেকে ১২ হাজার ৬৭০ টাকা আয় হয়।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) সাবেক মহাপরিচালক মো. শহজাহান কবীর মত প্রকাশ করেন, কৃষকের আয় এখনও অত্যন্ত কম। এই কারণে অনেক ছোট কৃষক ধীরে ধীরে কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছেন, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাঁর মতে, কৃষকরা সরে গেলে সেই শূন্যস্থান পূরণ করছেন বড় বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা, যারা কৃষিকে জীবিকা হিসেবে নয়, লাভের ব্যবসা হিসেবে দেখেন। ফলে ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে ‘ইনকাম অ্যান্ড প্রোডাক্টিভিটি অব স্মল-স্কেল ফুড প্রোডিউসার্স সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক এই জরিপটি পরিচালিত হয়। দেশের আট বিভাগের ১২ হাজার ৮৭৯টি কৃষি পরিবার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে বিবিএসের টেকসই কৃষি পরিসংখ্যান প্রকল্প। জরিপে জমির পরিমাণ, গবাদিপশুর সংখ্যা এবং বার্ষিক কৃষি আয়ের ভিত্তিতে কৃষকদের তুলনা করা হয়েছে। যারা এই তিনটি সূচকের নিচের ৪০ শতাংশের মধ্যে পড়েছেন, তাদের ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কৃষকের কম আয়ের বিষয়টি নতুন নয়। বাজারব্যবস্থা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে তারা তাদের উৎপাদনের প্রকৃত মূল্য পান না। সম্প্রতি এক সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির আলুচাষির উদাহরণ টেনে বলেন, টানা দুই বছর এক কোটি টনের বেশি আলু উৎপাদন হলেও চাষিরা উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে থাকা অতিরিক্ত খরচ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই কৃষকের আয় কমে যাচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হলেও ব্যাপারী, মিলার ও আড়তদারদের মাধ্যমে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে তার দাম বেড়ে ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা হয়। অর্থাৎ ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগে চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়, কিন্তু সেই অতিরিক্ত অর্থ কৃষকের হাতে যায় না।
বিভাগভেদে আয়ের পার্থক্য লক্ষণীয়। রাজশাহী বিভাগের ক্ষুদ্র কৃষকের বার্ষিক গড় আয় ৪৪ হাজার ৭০৭ টাকা, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে খুলনা বিভাগ, যেখানে গড় আয় ৪৪ হাজার ২৮ টাকা। অন্যদিকে সবচেয়ে কম আয় সিলেট বিভাগে, মাত্র ২৪ হাজার ৬৩৬ টাকা। জরিপে এই আঞ্চলিক বৈষম্যের কারণ বিশ্লেষণ করা হয়নি, তবে খুলনা অঞ্চলে হাঁস-মুরগি ও মৎস্য খাতের বিস্তার এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, পশুর জাত কৃষকের আয়ে বড় ভূমিকা রাখে। একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গরু থেকে বছরে গড় আয় ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৩ টাকা, যেখানে দেশি গরু থেকে আয় ১ লাখ ১৭ হাজার ৮৭৮ টাকা। একইভাবে, সোনালি জাতের মুরগি থেকে বার্ষিক আয় ৩৬ হাজার ৬৩৩ টাকা, ব্রয়লার থেকে ২৫ হাজার ৮৫৯ টাকা এবং দেশি মুরগি থেকে মাত্র ৪ হাজার ৯০২ টাকা। এটি প্রশ্ন তুলেছে যে উন্নত জাতের গবাদিপশু কেনার মতো পুঁজি বা সহজ ঋণসুবিধা ক্ষুদ্র কৃষকদের কতটা রয়েছে। যাদের সেই সামর্থ্য নেই, তাদের আয় তুলনামূলকভাবে কম রয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়েও আলোকপাত করা হয়েছে। গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগির পরিচর্যা ও দুধ দোহার মতো কাজে নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই শ্রমের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখনও সীমিত। জরিপ অনুযায়ী, ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশের নেতৃত্বে রয়েছেন নারী।


