দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান থাকার পরিস্থিতিতেও নীতি সুদহার হ্রাস করল বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ৩০ জুন জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) হার ১১.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুযায়ী, সুদহার কমলে বাজারে অর্থের জোগান বাড়ে এবং মানুষের ব্যয়যোগ্য আয় বৃদ্ধি পায়, যার ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মে মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রিজার্ভ মানি বা ভিত্তিমূলক মুদ্রার পরিমাণ ২১.৭৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ব্রড মানির প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ১২.৪৫ শতাংশ। রিজার্ভ মানি বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণ বিতরণ বাড়লে ভবিষ্যতে তা মুদ্রার সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। গত মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৪২ শতাংশ, যা ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। জুনে তা কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৯.১৬ শতাংশে নেমে এলেও সাম্প্রতিক বন্যার কারণে খাদ্যপণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় জুলাইয়ে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিতে মুদ্রার সরবরাহ বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে বন্ধ শিল্পকলকারখানা চালু করতে নেওয়া ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের প্রায় ১৯ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন রিজার্ভ মানি হিসেবে যোগ হচ্ছে। অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেওয়া নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে একক অর্থবছরে সর্বোচ্চ। সরকারের এই অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতে ক্রাউডিং আউট প্রভাব পড়েছে। গত জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪.৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বচাপ কেবল অতিরিক চাহিদা নয়, বরং গভীর কাঠামোগত ত্রুটির ফলাফল। সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি সংকট এবং বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব ও দুর্বল তদারকিই মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘায়িত করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো আনুষ্ঠানিক আর্থিক কাঠামোর অভাবে, যেখানে ফেডারেল রিজার্ভ নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়, বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ অপ্রাতিষ্ঠানিক ও নগদ নির্ভর অর্থনীতিতে মুদ্রার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করাটা অনেক কঠিন। ফলে শুধু নীতি সুদহারের তারতম্য করে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
এছাড়াও, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি 'চাহিদা'-কে দুর্বল করে ফেলেছে। এমন বাস্তবতায় সুদের হার কমালেও তা বিনিয়োগ বা ভোক্তা ব্যথায় রূপ নেবে না। একারণে বিশ্লেষকরা বাজার তদারকি জোরদার করা, অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ও দ্রুত কলকারখানা চালুর মাধ্যমে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও অর্থনীতির চাহিদা পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দিচ্ছেন।


