পোল্যান্ডভিত্তিক বিশ্বখ্যাত খুচরা বিক্রেতা লিপিপি এসএ-এর ঢাকা অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদ ও পুলিশ হয়রানির অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকের নতুন ক্রয়াদেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশ থেকে বার্ষিক প্রায় ৭০ কোটি ডলার (আনুমানিক ৮ হাজার ৬১০ কোটি টাকা) মূল্যের গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, যা খাত-সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, রাশিয়ার ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এফইএস রিটেইলের কাছে প্রায় ৪ কোটি ডলার বকেয়া আদায় করতে গিয়ে দুটি বায়িং হাউসের মালিক গত মাসে এলপিপির ঢাকা কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন। মামলার জেরে পুলিশ কয়েক কর্মকর্তার বাসভবনে রাতের অভিযান পরিচালনা করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ জুলাই তৈরি পোশাকশিল্পের মালিক সমিতি বিজিএমইএ, নিটওয়্যার মালিক সমিতি বিকেএমইএ এবং বায়িং হাউস মালিক সংগঠন বিজিবিএ-কে চিঠি দিয়ে লপিপি জানিয়ে দেন, অর্থ পরিশোধ-সংক্রান্ত বিরোধের প্রকৃত দায়ী তারা নয়। অথচ তাদের কর্মীরা হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন। এই অবস্থায় বাংলাদেশে ধাপে ধাপে ক্রয়াদেশ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

পূর্ণাঙ্গ তথ্যানুযায়ী, এরপর গত ৩১ জুলাই স্থানীয় সরবরাহকারীদের উদ্দেশ্যে পাঠানো অপর এক চিঠিতে এলপিপি স্পষ্টভাষা করে যে, গঠনমূলক সমাধানের চেষ্টা সত্বেও কোনো সমাধান হয়নি। সুতরাং নতুন ক্রয়াদেশ প্রদান এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে নতুন পণ্য উন্নয়ন সংক্রান্ত সব কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা জানানো হবে।

ঘটনার সূত্রপাত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এনসা ক্লথিং নামক একটি বায়িং হাউস গত বছর এফইইস রিটেইলের ক্রয়াদেশের বিপরীতে ৫২ হাজার ডলারের ট্রাউজার রপ্তানি করে, কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই পণ্যের দাম পরিশোধ করা হয়নি। অনাদায়ী পাওনা তুলতে গিয়েই আদালতের দ্বারস্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি। এনসা ক্লথিং-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল কবির জানান, প্রথমদিকে লপিপি নিজেই অর্থ পরিশোধ করতেন, তাই তারা কোনোভাবেই দায়িতি এড়াতে পারেন না। অপরদিকে, আরও চারজন সরবরাহকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, এলপিপির নৈতিক দায় শুধু তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, অর্থ পরিশোধের চূড়ান্ত দায়িত্ব এফইএস রিটেইলের।

তথ্য মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শুরু হওয়ার পর ২০২২ সালে মস্কোর ব্যবসা বিক্রি করে দেয় এলপিপি। পরবর্তীকালে কেসিএস ব্র্যান্ডের পরিবর্তে ২০২৪ সালে এফইএস রিটেইলকে বাংলাদেশী সরবরাহকারীদের সঙ্গ পরিচয় করিয়ে দেয় ঢাকা কার্যালয় এবং অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তাও দেয়। কিন্তু গত বছর থেকে পরিশোধে অনিয়মিত দেখা দিলে এই জটিলতার সৃষ্টি হয়।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা একাধিক বৈঠক করেছি, তবে আইনত এলপিপির কোনো দায় খুঁজে পাইনি। এলপিপি কর্মকর্তাদের হয়রানি বন্ধে পুলিশের মহাপরিদর্শককে আমরা চিঠি দিয়েছি।” ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই)-এর প্রশাসক মো. ফজলুল হক এ ব্যাপারে সতর্ক বার্তা দিয়ে বলেছেন, যারা রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করছেন তাদের আরও সচেতন হওয়া দরকার ছিল। বর্তমান সংকট সমাধানে উচ্চপর্যায়ের সমঝোতার দরকার রয়েছে, যাতে বকেয়াপূর্ণ রপ্তানিকারকরাও রক্ষা পান এবং একইসঙ্গে বিশ্বব্যাপী দেশের ভাবমূর্তি অটুট থাকে। বিশ্বের ৪৬টি দেশে ৩ হাজার ৭০০ বিপণিবেশে থাকা এলপিপি বাংলাদেশের অন্তত ৪৩ সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে, যার আওতায় আড়াই শ'র বেশি কারখানা জড়িত।