চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালের বিপরীতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রসংলগ্ন প্রায় ১৬ দশমিক ৩৭ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয় স্বাধীনতা কমপ্লেক্স। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে কনকর্ড প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ করে। ২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এর উদ্বোধন করেন। কমপ্লেক্সটিতে দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থাপনার ক্ষুদ্র প্রতিরূপ নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ ভবন, আহসান মঞ্জিল, কার্জন হল, লালবাগ কেল্লা, কান্তজিউ মন্দির, বড় কুঠি, ছোট সোনা মসজিদ এবং পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারসহ দেশের উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শন। এক সময় ১৬ একরের এই পার্কেই একসঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার বিষয়ে জানার সুযোগ পেতেন দর্শনার্থীরা। ফলে এটি ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

২০০৬ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’। নির্মাণ-পরবর্তী সময়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত পার্কটি পরিচালনা করে কনকর্ড। পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ইজারা নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কমপ্লেক্সটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে মেয়াদ শেষ হলে চসিক নতুন করে ইজারা নিতে আগ্রহ দেখায়নি। পরে একই বছরের নভেম্বরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কমপ্লেক্সটির ইজারা নেয়। তখন পার্কে প্রবেশের মূল্য ১৫০ টাকা করা হয়। সর্বশেষ ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠানটির একজন পরিচালক ছিলেন নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন, যিনি সাবেক সংসদ সদস্য মো. মহিউদ্দিন বাচ্চুর ভাই। গত বছরের ৯ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ইজারার চুক্তি শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত পার্কটি ইজারার মাধ্যমে পরিচালনা করছিল তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের একজন সংসদ সদস্যের ভাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠান। সরকার পতনের পর ওই দিন রাতে শত শত বিক্ষুব্ধ মানুষ পার্কে প্রবেশ করে বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালায়। এর পর থেকে পার্কটি আর খুলে দেওয়া হয়নি। টানা প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও বন্ধ রয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে পুরো কমপ্লেক্সই পরিণত হয়েছে আগাছায় ঢাকা পরিত্যক্ত স্থানে।

সম্প্রতি কমপ্লেক্সের মূল ফটকে পৌঁছালে দেখা যায়, একসময়ের জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্রের প্রবেশপথে তালা ঝুলছে। জেলা প্রশাসনের মৌখিক অনুমতি সাপেক্ষে দায়িত্বরত এক নিরাপত্তাকর্মী ফটক খুলে দেন। ফটক দিয়ে এগোতেই বাঁ পাশে চোখে পড়ে টিকিট কাউন্টার ও স্মারক সামগ্রীর দুটি দোকান। একটি দোকানে এখন নিরাপত্তাকর্মীদের অস্থায়ী থাকার জায়গা। পাশের দোকানটি ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ইট-পাথর। কয়েক কদম সামনে গিয়ে দেখা মেলে জাতীয় সংসদ ভবন। কাছে গিয়ে দেখা যায়, এর দেয়ালে শেওলা জমেছে, বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। বাঁ দিকে সামনে এগিয়ে গেলে স্বাধীনতা টাওয়ার। প্রায় ২৪ তলা সমান উচ্চতার এই টাওয়ারের চূড়ায় ছিল ঘূর্ণমান রেস্তোরাঁ। এখন লিফটগুলো নষ্ট, চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে কাচের টুকরা। টাওয়ারের বিপরীতে শিশুদের খেলার স্থানটিও এখন পরিত্যক্ত। পাশেই সেন্ট নিকোলাস চার্চ। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পথই প্রায় হারিয়ে গেছে আগাছার নিচে। কোথাও কোথাও এত উঁচু ঘাস জন্মেছে যে পথ চিনে সামনে এগোনোই কঠিন।

বিনোদন রাইডগুলোর বেহাল অবস্থাও চোখে পড়ে। রোলার কোস্টার, ফেরিস হুইল, মেরি-গো-রাউন্ড, শিশুদের বিভিন্ন রাইড—সবকিছুতেই মরিচা ধরেছে। অনেক জায়গায় যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া হয়েছে। বাম্পার কার এলাকার লোহার ছাউনিও ভেঙে নিচে পড়ে আছে। গাড়িগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ঘাস ঠেলে হাঁটতে হাঁটতে দেখা গেল বড় কুঠি। একসময় পার্কে ছোট ট্রেনের একটি স্টেশনও ছিল এটি। এখান থেকেই দর্শনার্থীরা ট্রেনে চড়ে পুরো পার্ক ঘুরে দেখতেন। তবে এখন ভবনের দেয়ালে ফাটল, শেওলা ও আগাছা। চারপাশে পোকামাকড়ের বিচরণ। পুরো রেলপথের বড় একটি অংশে লোহার রেললাইনই নেই। শুধু পাথর পড়ে আছে। আরও সামনে ট্রেন চলাচলের জন্য নির্মিত কৃত্রিম সুড়ঙ্গের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সুড়ঙ্গের মুখে পানি জমে আছে। চারপাশে কচুগাছ, আগাছা ও ঝোপঝাড়। পাশে পাহাড়ে ওঠার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে গিয়েও মাঝপথে থেমে যেতে হয়। ভেঙে পড়া বড় একটি গাছ পুরো পথ আটকে দিয়েছে। পাহাড়ি পরিবেশ তৈরির জন্য নির্মিত কৃত্রিম পাথরের কাঠামোগুলোও বিভিন্ন স্থানে ভেঙে পড়েছে।

মূল অংশে ফিরে ডান পাশ ধরে হাঁটতেই চোখে পড়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। সেটিও আগাছায় ঢেকে গেছে। একই চিত্র দেখা গেল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবনের প্রতিরূপেও। এর আরও এগিয়ে লালবাগ কেল্লায় দেখা যায় বিভিন্ন স্থানে ফাটল। পাশের কৃত্রিম জলাধারে আর পানি নেই। কার্জন হলের সামনের অংশও জঙ্গলের আড়ালে চলে গেছে। দূর থেকে ভবনের অংশ দেখা গেলেও কাছে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। একই অবস্থা কান্তজিউ মন্দিরের প্রতিরূপে। আহসান মঞ্জিলের সামনে গিয়ে দেখা যায়, সিঁড়ি থেকে শুরু করে ভবনের ভেতর পর্যন্ত গাছপালা জন্মেছে। ছোট সোনা মসজিদের প্রতিরূপে বিভিন্ন স্থানে ফাটল, খসে পড়েছে পলেস্তারা। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের প্রতিরূপও ঘন জঙ্গলের আড়ালে প্রায় অদৃশ্য। শহীদ মিনারেও দেখা গেছে ফাটল। সংসদ ভবনের পাশের কৃত্রিম লেকের পানি ঘোলাটে হয়ে গেছে। পানির ওপর জমেছে শেওলার স্তর। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, সম্প্রতি ভারী বর্ষণের সময় পুরো পার্কে গোড়ালি থেকে হাঁটুসমান পানি জমে ছিল। পার্কের বিভিন্ন স্থানে গ্রিল কেটে ভেতরে ঢোকার চিহ্ন রয়েছে। বর্তমানে নয়জন নিরাপত্তাকর্মী তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন। মোহাম্মদ বশর নামের এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, সুযোগ পেলেই দুর্বৃত্তরা ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও লোহার সামগ্রী চুরি করে নিয়ে যায়। বাধা দিতে গেলে অনেক সময় ধারালো অস্ত্র নিয়ে তেড়ে আসে, এমনকি পাথরও নিক্ষেপ করে। দীর্ঘদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না হওয়ায় এখন বেড়েছে মশা ও পোকামাকড়ের উপদ্রবও।

স্বাধীনতা কমপ্লেক্সের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘পার্কটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পরিদর্শন করে গেছেন। তবে এখন পর্যন্ত পার্কটির সংস্কার বা পুনরায় চালুর বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। আমরা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।’ ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ‘মিনি বাংলাদেশ’ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে পার্কটি বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দেন চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেন। সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমরা পার্কটি পুনরায় বরাদ্দ চেয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে লিখেছিও। ফারুক-ই-আজম সাহেব (সাবেক উপদেষ্টা) তখন কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। যদি আমাদের বরাদ্দ দেয়, তাহলে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে নগরবাসীর জন্য এটি সুস্থ বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলব।’ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান বলেন, ‘আমরা এমন একজন ইজারাদার চাই, যারা পুরো কমপ্লেক্স পরিষ্কার করে পুনর্গঠন করবে। প্রথম দরপত্রে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া পাইনি। তাই আমরা পুনরায় দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েছি সাড়ে চার মাস। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন আমার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো যোগাযোগ করেনি। যোগাযোগ করলে অবশ্যই আলোচনা করা যেত।’