বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলায় নারীদের পরিচালনায় গড়ে ওঠা একটি কমিউনিটিভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা উপকূলীয় অঞ্চলের পানিসংকট মোকাবিলায় নতুন দিশা দেখাচ্ছে। নদী ও খালের লবণাক্ত পানি পরিশোধন করে প্রায় আড়াই হাজার পরিবারকে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে এই প্রকল্পের মাধ্যমে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে তাদের দূরের পুকুর থেকে পানি আনতে হতো কিংবা অনিরাপদ পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করতে বাধ্য হতেন, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করত। এখন নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে সহজেই বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে পারছেন তারা।

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে অক্সফাম ও এমটিবি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনএসএস (নজরুল স্মৃতি সংসদ) এই প্রকল্পের সূচনা করে। বর্তমানে পাথরঘাটার বিভিন্ন স্থানে দুটি বড় ও ছয়টি ছোট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। বড় প্ল্যান্টে ঘণ্টায় দেড় হাজার লিটার এবং ছোট প্ল্যান্টে ৫০ লিটার পানি বিশুদ্ধ করা সম্ভব। প্রতিদিন সকালে দুই ঘণ্টা ও বিকেলে দুই ঘণ্টা প্ল্যান্টগুলো চালু থাকে। উপকারভোগীরা প্রতি লিটার পানি মাত্র ৩০ পয়সায় কিনছেন। পানি বিক্রির অর্থ সরাসরি ব্যবস্থাপনা কমিটির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয় এবং মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বাদ দিয়ে উদ্বৃত্ত অর্থ সুবিধাভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হয়।

প্রকল্পটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর পুরো ব্যবস্থাপনা নারীদের হাতে। পানি উৎপাদন, বিতরণ, হিসাবরক্ষণ ও দৈনন্দিন তদারকি—সবকিছুই করছেন সুবিধাভোগী নারীরা। গাববাড়িয়া আবাসনের বাসিন্দা নুরজাহান বেগম জানান, তার পরিচালনায় থাকা শোধনাগার থেকে ৫০টি পরিবার নিয়মিত পানি নেয়। শুধু গাববাড়িয়াই নয়, চরদুয়ানি, তাফালবাড়িয়া, খলিফার হাট, মধ্য জ্ঞানপাড়া, দশঘর ও হোগলাপাশা—সাতটি গ্রামের প্রায় আড়াই হাজার পরিবার এই সুবিধা পাচ্ছে। প্রতিটি পরিবারের তথ্য রেজিস্টারে সংরক্ষণ করে ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই উদ্যোগ তাদের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছে। খলিফার হাটের ফাতেমা বেগম, তাজেনুর বেগম ও হনুফা বেগম জানান, আগে শুকনা মৌসুমে পুকুরের পানি নোংরা ও লবণাক্ত হয়ে যেত। বাধ্য হয়ে সেই পানি ব্যবহার করতে হতো। এখন শোধনাগার চালু হওয়ায় তাদের আর শিশুদের নিয়ে বারবার হাসপাতালে যেতে হচ্ছে না। ডায়রিয়া, আমাশয় ও চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ অনেকটাই কমে গেছে। গাববাড়িয়ার বাসিন্দা সাহেদা বেগম বলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে দূর থেকে পানি আনা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এখন আবাসনেই নিরাপদ পানি পাওয়ায় তার পরিবারের কারও আর অসুখ নেই। আরেক বাসিন্দা শারমিন আক্তার জানান, আগে আধা কিলোমিটার দূরের পুকুর থেকে পানি আনতে হতো, যা নিরাপদ ছিল না। এখন সেই কষ্ট দূর হয়েছে।

এনএসএসের নির্বাহী পরিচালক শাহাবুদ্দিন পান্না জানান, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রকল্পটি চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে উন্নীত না হলে প্ল্যান্টগুলো সুবিধাভোগী নারীদের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যবস্থাপনা কমিটি ইতিমধ্যে প্ল্যান্ট পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাদের কারিগরি ও আর্থিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং বড় ত্রুটির ক্ষেত্রে টেকনিশিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

জাতীয় পানিসম্পদ সুরক্ষা কমিটির বরিশাল বিভাগীয় সদস্য রফিকুল আলম মনে করেন, পাথরঘাটার এই অভিজ্ঞতা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির টেকসই সমাধানের একটি বাস্তব উত্তর হয়ে উঠছে। এখানে প্রযুক্তি, কমিউনিটির অংশগ্রহণ ও নারীনেতৃত্ব একসঙ্গে কাজ করছে। এই উদ্যোগ দেখিয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলের পানিসংকট মোকাবিলায় নারীদের কেন্দ্র করে গড়ে তোলা টেকসই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হতে পারে।