বাংলা গানের অমর কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন মঙ্গলবার ১৬ জুন পালিত হয়েছে। এই দিনটি কেবল একটি জন্মদিন নয়, বরং বাংলা সংস্কৃতির এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা বলে মনে করেন তাঁর অনুরাগীরা। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর গান এখনো নতুন প্রজন্মের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর ছবি, গান ও স্মৃতিচারণা। ইউটিউব, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও ফেসবুকে হাজারো মানুষ নতুন করে শুনেছেন তাঁর কালজয়ী গান।

তবে এই জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে এক কঠিন সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯২০ সালের ১৬ জুন বেনারসে জন্মগ্রহণ করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। পরে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন। ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে পড়ার সময় তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষের মতো প্রতিভাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে। সেই সময়ে কেউই তাঁকে ভবিষ্যতের গায়ক হিসেবে কল্পনা করেনি। তিনি নিজেও স্বপ্ন দেখতেন লেখক হওয়ার। এমনকি 'দেশ' পত্রিকায় তাঁর গল্পও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে অন্য পথে নিয়ে যায়।

সংগীতের প্রতি তাঁর টান ছোটবেলা থেকেই ছিল। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই গ্রামোফোনে গান শুনে শুনে সুর আত্মস্থ করতেন। বন্ধু শ্যামসুন্দরের বাড়ির হারমোনিয়াম ও গ্রামোফোনই ছিল তাঁর প্রথম শিক্ষা। স্কুলজীবনে একবার বন্ধুদের সঙ্গে গান গাওয়ার অপরাধে তাঁকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বাবার অনুরোধে পরে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। এই ঘটনা তাঁর চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের উৎসাহে ১৯৩৫ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে অডিশন দেন হেমন্ত। অডিশনে সফল হলেও পরিবারের আপত্তি ছিল। পরে মা ও বন্ধুদের চেষ্টায় বাবার সম্মতি মেলে। রেডিওতে গাওয়ার জন্য সুভাষ নিজেই লিখে দেন 'আমার গানেতে এলে নবরূপে চিরন্তনী'। রেকর্ড কোম্পানিগুলো অবশ্য সহজে দরজা খোলেনি। সেনোলা, পাইওনিয়ার, মেগাফোন, এইচএমভি—কেউই আগ্রহ দেখায়নি।

অবশেষে বাবার বন্ধু শান্তি বসুর উদ্যোগে পরিচয় হয় সুরকার শৈলেশ দত্তগুপ্তের সঙ্গে। তাঁর কণ্ঠ শুনে মুগ্ধ হয়ে তিনি দুটি গান রেকর্ড করার ব্যবস্থা করেন। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয় হেমন্তের প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড—'জানিতে যদি গো তুমি' ও 'বলো গো বলো মোরে'। এই রেকর্ডই তাঁর দীর্ঘ সংগীতযাত্রার ভিত্তি স্থাপন করে।

সংগীতজীবনের শুরুর দিকে তাঁকে 'ছোট পঙ্কজ' নামে ডাকা হতো, কারণ পঙ্কজ মল্লিকের প্রভাব স্পষ্ট ছিল। তবে ধীরে ধীরে নিজস্ব গায়কি গড়ে তোলেন তিনি। ১৯৪৪ সালে নিজের সুরে প্রকাশিত 'কথা কয়ো নাকো, শুধু শোনো' বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সূচনা করে। এই সময়েই সলিল চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। তাঁদের মিলন বাংলা গানের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা। 'কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা', 'রানার', 'অবাক পৃথিবী', 'পাল্কীর গান'—এসব গান হয়ে ওঠে সময়ের দলিল।

পঞ্চাশের দশকে উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর জুটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। 'শাপমোচন', 'হারানো সুর', 'সপ্তপদী', 'মায়ামৃগ'সহ অসংখ্য ছবিতে উত্তমের ঠোঁটে শোনা গেছে হেমন্তের কণ্ঠ। পর্দায় উত্তমকুমারের ব্যক্তিত্ব আর হেমন্তের উষ্ণ কণ্ঠ মিলে তৈরি হয়েছিল অনন্য রোমান্টিক নায়ক-ইমেজ।

মুম্বাই যাওয়ার পর হিন্দি চলচ্চিত্রেও তিনি সফল হন। 'ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনী ফির কাহাঁ', 'হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা'—এসব গান তাঁকে সর্বভারতীয় জনপ্রিয়তা এনে দেয়। 'নাগিন' ছবির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে হলিউডের 'সিদ্ধার্থ' ছবিতে তাঁর গাওয়া বাংলা গান 'ও নদী রে' ও 'পথের ক্লান্তি ভুলে' ব্যবহৃত হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলা গানকে পৌঁছে দেয়।

রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি রবীন্দ্রনাথের গানগুলোকে সহজ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলেন মধ্যবিত্ত শ্রোতাদের কাছে। 'আমার আর হবে না দেরি', 'পুরানো সেই দিনের কথা'—এসব গান তাঁর কণ্ঠে পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়।

১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর গান এখনো বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাদ্রের দুপুর, পৌষের কুয়াশা, ফাল্গুনের হাওয়া—প্রতিটি ঋতুর জন্য তাঁর আলাদা গান আছে। প্রেম, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা, স্মৃতি—সব আবেগের সঙ্গেই তিনি জড়িয়ে আছেন। এ কারণেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বাঙালির জীবনযাপনের অংশ হয়ে রয়েছেন।