২০১৪ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি, রেকর্ড ভাঙা শীতের প্রকোপ উপেক্ষা করে মিন্টো পার্কের বেল ভিউ হাসপাতালের সামনে বদলে গিয়েছিল কলকাতার ছবি। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডের ওই ছোট্ট অথচ পরিচিত হাসপাতালটির সামনে সাধারণ উৎসুক জনতা, টেলিভিশন ক্যামেরা আর ট্রাইপডের এক অদ্ভুত সমাবেশ। ভেতরে কে আছেন, তা সবার জানা। কিন্তু উচ্চারণ হতো না নাম, সবাই বলতেন ‘দিদি’। অনেকে আবার ‘মিজ সেন’ বা ‘ম্যাডাম সুচিত্রা’ সম্বোধনও করতেন। ২৬ দিনের দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রতি মুহূর্ত হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থেকে দেখা হয়েছিল। দরজা খুলতেই কোনো নার্স বেরোলে সমবেত সবার একই প্রশ্ন, ‘এখন কেমন আছেন দিদি?’ উত্তর কখনো মিলত, কখনো মিলত না। সেই না-পাওয়া উত্তরই ছিল সবচেয়ে ভারী। হাসপাতালের অভ্যন্তরে করাকড়ির গল্প শোনা যেত। একটি বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে খবর আসত যে, সুচিত্রা সেনের নিজের ইচ্ছাতেই পরিচর্যায় নিয়োজিত তিন নার্সের ছুটি বাতিল রাখা হয়েছিল। অপরিচিত কেউ কাছে আসলে তিনি বিরক্ত হতেন, অনেক সময় চিকিৎসা নিতেও আপত্তি করতেন। কার্ডিওলজি, পালমোনোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার—হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগ যেন অনুভব করছিল, এটি কেবল একটি চিকিৎসা নয়, এটি ইতিহাসকে ধরে রাখার চেষ্টা।
তথ্যের অন্যতম ভরসা ছিল মেডিক্যাল বুলেটিন। দিনের বিভিন্ন সময়ে যখন শোনা যেত ‘স্থিতিশীল’, তার পরক্ষণেই আসতো ‘আশঙ্কাজনক’—এই ওঠানামা শহরের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। কাজের চাপে সংবাদকর্মীরা নির্দিষ্ট জায়গা গড়ে নিয়েছেন, কেউ কেউ টানা ৭২ ঘণ্টা জেগে ছিলেন। কেউ গাড়িতে রাত কাটাচ্ছিলেন, কেউবা পার্কে। তাদের মধ্যে এক নিরব সমঝোতা তৈরি হয়েছিল—এটা আর শুধু সংবাদ নয়।
১৭ জানুয়ারি, শুক্রবার। সকাল সাতটা নাগাদ গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে অবস্থা আবার খারাপ। পূর্বদিন খবর ছিল, শারীরিক অবস্থায় উন্নতি, এমনকি বাড়ি ফেরার প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু ভোররাতে আসে সংকট। অন্য একটি হাসপাতালে আত্মীয়ের চিকিৎসার মাঝেও প্রস্তুত ছিলেন অনেকে, তবু কেউ যেন প্রস্তুত ছিলেন না। সুচিত্রা সেনের মারা যাওয়া যেন অসম্ভব ছিল।
একটা সময় পালস রেট কমে আসার খবর ভেসে এল। সকাল আটটার পর হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়—ডাক্তারি ভাষায় ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। ভেতরে কন্যা মুনমুন সেন মায়ের কানে কাছে মুখ নিয়ে ডেকে যাচ্ছেন ‘মা, মা’। নাতনি রাইমার কান্না থামছিল না। সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে চলে গেলেন চিরপ্রস্থানের পথে। হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, নিজেও আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়। হাসপাতাল চত্বরে বেলুর মঠের তিন সন্ন্যাসী শ্রীরামকৃষ্ণের প্রসাদি মালা পরিয়ে দেওয়ার মুহূর্তে নেমে আসে স্তব্ধতা। সাদা বেনারসি ও সোনালি গরদের চাদরে সজ্জিত করে শেষবারের মতো তোলা হয় শববাহী গাড়িতে। গাড়ি এগোতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অগণিত মানুষ নীরবে হাত জোড় করেছিলেন, কেউ ফুল ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন, কেউ ফোঁপাচ্ছিলেন নিঃশব্দে। ভিড় থেকে ভেসে আসছিল চাপা গুঞ্জন—‘আর এমন কাউকে পাব কি আমরা?’
টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে একজন ছোটবেলার ছড়া আওড়াচ্ছিলেন, “আকাশ থেকে নেমে এলো ছোট্ট একটা প্লেন/ সেই প্লেন এ বসে ছিল লাল টুকটুক মেম…”। স্মৃতির ঝাপি খুলে যাওয়ার সেদিনকি ছিল শেষ। বালিগঞ্জের ‘বেদান্ত’ বাড়িতে নিয়ম রক্ষার আনুষ্ঠানিকতা শেষে শববাহী গাড়ি কেওড়াতলার পথে রওনা দিল। রাস্তাজুড়ে যেন এক নিঃশব্দ শোকযাত্রা—কোথাও স্লোগান নেই, নেই উচ্চকিত কান্না, শুধু চাপা দীর্ঘশ্বাস। বেলা ১টা ৪০ মিনিটে মুনমুনের হাতে মুখাগ্নি। শ্মশানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে মনে হচ্ছিল, কৈশোর, যৌবন, ভালোবাসা আর স্মৃতির এক বড় অংশ যেন সব একসঙ্গে শেষ হয়ে গেল। চার ঘণ্টা পর বাবুঘাটে গঙ্গার বিসর্জন।
পরবর্তী সকালে যেন শহরের রং বদলে গেল। পাড়া-মহল্লা, ক্লাব, চায়ের দোকান—সবখানেই সাদাকালো প্রতিকৃতি। প্রতিমার নিচে ফুল, কোথাও প্রদীপ। নিউমার্কেটের যে পানের দোকানে রফির গান বাজত, সেদিন সেখানে ভেসে আসছিল সুচিত্রার সিনেমার গান। হঠাৎ করেই ভিডিও-সিডির দোকানে ‘সপ্তপদী’ ও ‘হারানো সুর’-এর চাহিদা বেড়ে গেল। খালপাড়ে যেতে যেতে প্রতিটি দোকানে বাজতে থাকা তার গান আর দেয়ালে ঝোলানো ছবিতে মালা দেখে মনে হচ্ছিল, কলকাতা যেন নিজের মতো করেই খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে।
মৃত্যুর পরের দিনগুলোতে বালিগঞ্জের ‘বেদান্ত’ বাড়িটি হয়ে ওঠে সবার কেন্দ্রবিন্দু। কঠোর নিয়ন্ত্রণের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ঢল নামে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ নীরবে ফুল রেখে যেতে। সংবাদকর্মীরাও অস্থায়ী আস্তানা তৈরি করেছিল সেই গলিতে—পুরোনো সুচিত্রা-উত্তমের আড্ডা আর কফির কাপের ধোঁয়ার মাঝে। জীবনে যাকে ফুল পৌঁছানো ছিল প্রায় অসম্ভব, মৃত্যুর পর সেই ফুলে ফুলে ভরে উঠল তার ঘরের বাইরের দেয়াল, গেট আর রাস্তা।
পেশাগত জীবনে অনেক বড় মানুষের শেষ বিদায়ে দেখা হয়েছে, বহু শোকযাত্রা কভার করা হয়েছে—নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে। কিন্তু সুচিত্রা সেনের চলে যাওয়ার দিনগুলো ছিল ব্যতিক্রম। তিনি কেবল অভিনেত্রী ছিলেন না, ছিলেন এক স্মৃতির নাম, একটি অধ্যায়। তাকে মানুষ নিজের কৈশোর, যৌবন আর প্রথম ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছিল। সাদাকালো ছবির আলোছায়া, মা-খালার গল্পের নায়িকা, ক্লান্ত দুপুরের গান—সব মিলে তিনি ছিলেন হারানো সময়ে ফিরে পাওয়ার অনুভূতি।
১৭ জানুয়ারি ২০১৪—সেদিন কলকাতায় যেন ফিরে এসেছিলেন ‘হারানো সুর’-এর রমা, ‘সপ্তপদী’র রিনা ব্রাউন, ‘সাত পাকে বাঁধা’র অর্চনা। ফিরে এসে শহরকে বুঝিয়ে দিয়ে ছিলেন, তিনি আসলে কোথাও যাননি। এতকাল লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেও তার উপস্থিতি মানুষের স্মৃতি থেকে কখনো ফুরোয়নি। সুচিত্রা ছিলেন, আবার সুচিত্রা অথচ ছিলেন না। আর হয়তো সেই না-থাকাটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় উপস্থিতি।




