বিশ্বজুড়ে কালোবাজারে বিক্রি হওয়া পরীক্ষামূলক ওজন কমানোর ওষুধ রেটাট্রুটাইড নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন দেশে এই ইনজেকশনের নকল সংস্করণ ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নির্মাতা এলি লিলি এখন এই অবৈধ বাণিজ্য রুখতে আইনি ও প্রশাসনিক উভয় পথেই চাপ বাড়াচ্ছে।
প্রথমে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে রেটাট্রুটাইড অনুমোদিত হলে কোম্পানিটির বার্ষিক আয় ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। কিন্তু কালোবাজারের কারণে ওষুধটির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা কোম্পানির জন্য বড় ঝুঁকি। বর্তমানে লিলি বড় পরিসরের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে এবং আগামী বছরের শুরুতে মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের কাছে অনুমোদনের আবেদন জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
এই প্রেক্ষাপটে লিলি সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে, যাদের মধ্যে অনেকেই টেক্সাসে অবস্থিত। এসব প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা স্পাগুলিতে অবৈধভাবে রেটাট্রুটাইড বিক্রি করছে। মামলা দায়েরের পাশাপাশি কোম্পানিটি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। আইনি নথিতে গ্রাহক অভিযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা গ্রাহকদের ডোজ নির্ধারণে সাহায্য করার জন্য ক্যালকুলেটর সরবরাহ করত—যা সাধারণত লাইসেন্সপ্রাপ্ত চিকিৎসকের কাজ।
প্রায় দুই বছর ধরে এলি লিলি ভোক্তাদের সতর্ক করে আসছে যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন না পাওয়া এই ওষুধের নকল সংস্করণ অনলাইনে, সুস্থতা কেন্দ্র এবং স্পাগুলিতে বিক্রি হচ্ছে। বিশ্বে কোথাও এটি অনুমোদিত নয়।
লিলির গ্লোবাল পেশেন্ট সেফটি বিভাগের সহযোগী ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাক্স ডেনিং এই লড়াইকে “হুইক-এ-মোল” খেলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি জানান, নকল ওষুধগুলো প্রায়ই অনিয়ন্ত্রিত বিদেশি প্রস্তুতকারকদের দ্বারা তৈরি হয়। “এটি বিশাল সমস্যা, বৈশ্বিক সমস্যা। একা এটি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়,” তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন। কোম্পানির শেয়ার বুধবার নিউইয়র্কে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে ১ শতাংশ কমে।
অবৈধ বাণিজ্যের পেছনে ক্রেডিট কার্ড কোম্পানি, শিপিং ফার্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা রয়েছে বলেও লিলি দাবি করেছে। কোম্পানি একে “জরুরি জনস্বাস্থ্য সংকট” হিসেবে অভিহিত করেছে। ডেনিং আরও জানান, লিলি যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, সৌদি আরব ও হংকংয়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তিনি নিয়ন্ত্রক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রতি সীমান্ত অতিক্রম করে অপরাধী নেটওয়ার্ক ভাঙার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
একই সময়ে, মার্কিন এফডিএ স্পষ্ট করে বলেছে, ফার্মেসিগুলোর জন্য রেটাট্রুটাইড কম্পাউন্ড করা অবৈধ। ২০২৪ সাল থেকে এফডিএ অন্তত ১৬টি কোম্পানিকে সতর্কীকরণ চিঠি পাঠিয়েছে যারা এটি বিক্রির দাবি করে। তবে ১১ আগস্ট পর্যন্ত ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো নকল সংস্করণ সরবরাহ করছে। এফডিএর এক মুখপাত্র গ্রাহকদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ না হলে রেটাট্রুটাইড ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি যোগ করেন, “কম্পাউন্ড করা ওষুধ এফডিএ অনুমোদিত নয়, অর্থাৎ সংস্থাটি তাদের নিরাপত্তা, কার্যকারিতা বা গুণগত মান পর্যালোচনা করে না।”
পর্দার আড়ালে লিলি বছরের পর বছর ধরে বৈশ্বিক রেটাট্রুটাইড বাণিজ্য ব্যাহত করতে কাজ করছে। কোম্পানি ২০০টির বেশি সত্তাকে এফডিএ, মার্কিন বিচার বিভাগ, রাজ্য অ্যাটর্নি জেনারেল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পেশাদার লাইসেন্সিং বোর্ডের কাছে পাঠিয়েছে। ১০০টির বেশি দেশে ১৪ হাজারের বেশি ওয়েবসাইট, বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও পণ্য তালিকা রিপোর্ট করা হয়েছে। তবুও কিছু কোম্পানি দুর্বল ভোক্তাদের কাছে বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তু প্রচার অব্যাহত রেখেছে।
লিলি ও প্রতিদ্বন্দ্বী নভো নর্ডিস্ক এ/এস ইতোমধ্যেই তাদের জনপ্রিয় ওজন কমানোর ওষুধ জেপবাউন্ড ও ওয়েগোভির নকল সংস্করণের বিরুদ্ধে একই ধরনের লড়াই চালাচ্ছেন। তবে রেটাট্রুটাইডের ক্ষেত্রে এই সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই ওষুধ নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে, বিশেষ করে লিলির মধ্যম পর্যায়ের গবেষণার ফল প্রকাশের পর থেকে, যেখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে এটি বাজারের অন্যান্য ওজন কমানোর ওষুধের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হতে পারে। এরপর থেকে বিশ্বজুড়ে মানুষ কালোবাজারি সংস্করণ কিনতে ছুটছে; বিদেশি বিক্রেতারা “গবেষণার জন্য” লেবেল দিয়ে এসব বিক্রি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওষুধটি “রেটা” বা “আর৩টা”, কখনো “রাতাতুই” নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে, কারণ টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ওজন কমানো-সম্পর্কিত বিষয়বস্তুর উপর নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর উপায় খুঁজে বের করছে ব্যবহারকারীরা।
ফেডারেল ও রাজ্য কর্তৃপক্ষের কিছু “উৎসাহব্যঞ্জক” পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। গত বছর সিনসিনাটিতে কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের একটি বড় জব্দ অভিযান চালানো হয়। ফেডারেল প্রসিকিউটররা অবৈধ বিক্রেতাদের লক্ষ্য করছে; গত মাসে জনপ্রিয় একটি পেপটাইড কোম্পানির মালিককে, যে রেটাট্রুটাইড বিক্রি করত, প্রায় ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ কালোবাজারি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কিছু অগ্রগতি দেখাচ্ছে, যদিও চ্যালেঞ্জ এখনো ব্যাপক।




