ইংলিশ ফুটবলে গোলরক্ষকদের কৌশলগতভাবে সময় নষ্টের প্রবণতা বন্ধ করতে নতুন একটি পরীক্ষামূলক নিয়ম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই নিয়মের পক্ষে একমত হয়েছে ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ), প্রিমিয়ার লিগ, ইংলিশ ফুটবল লিগ (ইএফএল), ন্যাশনাল লিগ এবং উইমেন্স সুপার লিগ। আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (ইফাব) ইতিমধ্যে এই পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছে। রেফারিদের সংগঠন ‘প্রো রেফ’-এর প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা হাওয়ার্ড ওয়েবের নেতৃত্বে বিভিন্ন লিগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো গোলরক্ষক চোটের কারণে মাঠে বসে পড়লে এবং ফিজিওর প্রয়োজন হলে খেলা থামানোর পর দলের কোচকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে একজন আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের নাম চতুর্থ অফিশিয়ালকে জানাতে হবে। ওই খেলোয়াড়কে এক মিনিটের জন্য মাঠের বাইরে থাকতে বাধ্য করা হবে। কোচ যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো নাম না দেন, তাহলে দলের অধিনায়ককেই মাঠ ছাড়তে হবে। এই নিয়মের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ প্রথম দেখা যাবে আগামী শনিবার কারাবাও কাপের প্রাথমিক পর্বে ট্রানমেয়ার ও রচডেলের মধ্যকার ম্যাচে।

অস্ট্রেলিয়ার এ-লিগেও এই নিয়মের একটি ভিন্ন রূপ চালু হচ্ছে। সেখানে গোলরক্ষকের চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সব সময় অধিনায়ককেই মাঠের বাইরে যেতে হবে। সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোয় গোলরক্ষকের চোটের অজুহাতে খেলা থামিয়ে কৌশলগত বিরতি নেওয়ার ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে, যা নিয়ে ফুটবল মহলে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। অনেক সময় দেখা যায়, গোলরক্ষক মাঠে বসে পড়ে ফিজিও ডাকেন এবং সেই সুযোগে দলের বাকি সদস্যরা টেকনিক্যাল এরিয়ার কাছে জড়ো হয়ে কোচের কাছ থেকে নির্দেশনা নেন। নির্দেশনা শেষ হলেই গোলরক্ষক উঠে দাঁড়িয়ে খেলায় ফিরে আসেন। প্রতিপক্ষ যখন ভালো খেলছে এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে, তখন তাদের ছন্দ নষ্ট করতেও এই কৌশল ব্যবহার করা হয়।

গত নভেম্বরে লিডস ইউনাইটেডের কোচ ড্যানিয়েল ফার্কে অভিযোগ করেছিলেন, ম্যানচেস্টার সিটির গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোনারুম্মা ইচ্ছাকৃতভাবে চোটের ভান করে খেলা থামিয়েছেন, যাতে নিয়মের ফাঁক কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের ছন্দ নষ্ট করা যায়। গত ফেব্রুয়ারিতে ইফাবের বার্ষিক সাধারণ সভায় ফিফা রেফারিদের প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা বলেছিলেন, গোলরক্ষকের কৌশলগতভাবে খেলা থামানোর প্রবণতা বন্ধে কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা এখন অগ্রাধিকার। তিনি ২০২৬ বিশ্বকাপে ম্যাচ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, খেলা বন্ধ থাকলেও খেলোয়াড়দের যেন টেকনিক্যাল এরিয়ায় গিয়ে জড়ো হতে না দেওয়া হয়। তবে এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়, কারণ প্রতিটি অর্ধে থাকা তিন মিনিটের পানিবিরতি কোচদের খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলার স্বাভাবিক সুযোগ তৈরি করে দেয়।

ইংলিশ ফুটবলের কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু খেলোয়াড়দের টেকনিক্যাল এরিয়ায় যেতে বাধা দিলেই কোচরা গোলরক্ষকের মাধ্যমে খেলা থামানোর কৌশল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবেন না। তাই তারা এমন একটি নিয়ম চালু করছে, যা আউটফিল্ড খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আউটফিল্ড কোনো খেলোয়াড়ের চিকিৎসার জন্য ফিজিও মাঠে গেলে তাঁকেও এক মিনিটের জন্য মাঠের বাইরে থাকতে হয়। এই নতুন নিয়মের উদ্দেশ্য হলো কৌশলগতভাবে খেলা থামানোর সুযোগ নেওয়ার আগেই কোচদের নিরুৎসাহিত করা।

জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ম্যাচ অব দ্য ডে–এর বিশ্লেষক ড্যানি মারফি আগেই বলেছিলেন, নিয়মপ্রণেতারা চাইলে এই ফাঁক খুব সহজেই বন্ধ করতে পারেন। মারফির মতে, গোলরক্ষক চোট পেয়ে মাঠে বসে পড়লে তার বদলে একজন আউটফিল্ড খেলোয়াড়কে মাঠের বাইরে যেতে হবে, তাহলে সবার জন্যই নিয়মটি ন্যায্য হবে। এটি ছোট একটি পরিবর্তন হলেও এর প্রভাব হবে অনেক বড়। নতুন নিয়মে কোনো খেলোয়াড় চিকিৎসার সময় টাচলাইনের পাশে গিয়ে কোচের সঙ্গে কথা বললে রেফারিরা তাতে বাধা দেবেন না। তবে আশা করা হচ্ছে, এক মিনিট ১০ জন নিয়ে খেলার ঝুঁকি দলগুলোকে এমন কৌশল ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করবে। বিশেষ করে ম্যাচের শেষ দিকে, যখন কোনো দল এগিয়ে থেকে ফল ধরে রাখতে চায়, তখন গোলরক্ষকের চিকিৎসার অজুহাতে খেলা থামিয়ে প্রতিপক্ষের ছন্দ নষ্ট করার প্রবণতা দেখা যায়। নতুন নিয়মে সে ক্ষেত্রে দলটিকে এক মিনিট ১০ জন নিয়ে খেলতে হবে।

তবে কয়েকটি পরিস্থিতিতে আউটফিল্ড খেলোয়াড়কে মাঠ ছাড়তে হবে না। যেমন—গোলরক্ষক যদি জানান যে তার ফিজিওর প্রয়োজন নেই এবং তার কারণে খেলা বন্ধ না হয়, গোলরক্ষক ও একই দলের একজন আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে সংঘর্ষ হলে, গোলরক্ষক ফাউলের শিকার হয়ে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে, গোলরক্ষকের রক্তক্ষরণ হলে এবং গুরুতর চোট বা কনকাশনের ঘটনা ঘটলে এবং তাঁকে বদলি করতে হলে। এ ছাড়া গোলরক্ষককে বদলি করা হলে সেই পরিবর্তন করতে কোনো ধরনের বিলম্ব করা হবে না। তবে নতুন নিয়ম নিয়ে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, এক মিনিটের জন্য মাঠের বাইরে যেতে হতে পারে—এ কারণে গোলরক্ষক কিংবা আউটফিল্ড খেলোয়াড়েরা চোট পেয়েও চিকিৎসা না নিয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। ইফাব জানিয়েছে, পুরো মৌসুমে পরীক্ষামূলক এই নিয়মের ফলাফল তারা নিয়মিত পর্যালোচনা করবেন। সবকিছু সন্তোষজনক হলে ২০২৭-২৮ মৌসুম থেকে এটি বিশ্বজুড়ে স্থায়ী নিয়ম হিসেবে চালু হতে পারে।