বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত ব্র্যাক সেন্টারে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ‘নেভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস: ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু এ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক একটি সংলাপের আয়োজন করে। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। মন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সরকারের পদক্ষেপের বিস্তারিত বর্ণনা দেন।

মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে যে সংকট শুরু হয়েছে, তা নিরসনে বর্তমানে সরকারের সামর্থ্য সীমিত। তিনি বলেন, চলমান সংকটকালে তার হাতে কার্যকর কোনো উপায় নেই। কারণ, নতুন করে গ্যাস উত্তোলন সম্ভব নয় এবং এফএসআরইউ ছাড়া বিদ্যমান গ্যাস খালাস করে জাতীয় গ্রিডে পৌঁছানোও সম্ভব নয়। তার ভাষায়, বিদেশি প্রকৌশলীরা যতক্ষণ না মেরামতের কাজ শেষ করছেন, ততক্ষণ কেবল দিন গোনা ও অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। পাশাপাশি কম লোডশেডিং নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনার কৌশল অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সঙ্কটের কারিগরি দিক ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী জানান, নতুন করে হঠাৎ গ্যাস উত্তোলন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে এফএসআরইউ সচল না থাকলে বিদ্যমান গ্যাস খালাস করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ দেওয়াও সম্ভব নয়। মেরামতের কাজ শেষ হলে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে হবে। কারিগরি সমন্বয়ের জন্য পুরো সিস্টেমটি টানা ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন বন্ধ রাখতে হবে বলে তিনি সতর্ক করেন। এর ফলে সাময়িকভাবে গ্যাসের তীব্র ঘাটতি দেখা দেবে।

মেরামত কাজে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা নিয়োজিত রয়েছেন। ভবিষ্যৎ জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০২৯ সালকে লক্ষ্য করে সরকার অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দেওয়া হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে মন্ত্রী জানান।

শিল্পখাতে গ্যাস সংকট হ্রাসে বিকল্প উপায় হিসেবে ভোলা থেকে কনটেইনার ট্রাকে করে গ্যাস কারখানায় পৌঁছে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে একটি কোম্পানিকে, যা ৩০টি ট্রাক পরিচালনা করবে। মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি কনটেইনারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের সুবিধা তৈরি নিয়েও আলোচনা চলছে। তাছাড়া, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে “গরিবের টেসলা” আখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, এগুলোর বেশিরভাগই রাত ১২টার পর অবৈধ সংযোগে চার্জ হয়। ফলে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সময় রাত ১২টায় সরে গিয়ে মোট চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে সরকারি কর্মচারীরা হামলার শিকার হচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তেলের বাজারে গুজব ছড়ানোর কারণে সংকট আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে জানিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো নির্দিষ্ট সংস্থাকে একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না; বরং শর্ত মেনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও তেল আমদানি করতে পারে—এমন একটি নতুন নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে।

সৌরবিদ্যুৎকে উৎসাহিত করতে সোলার ব্যাটারি ও ইনভার্টারের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে মাত্র ৫ শতাংশ করা হয়েছে এবং এই খাতে পাঁচ বছরের করছাড় সুবিধা দেওয়া হয়েছে। নিজেকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে মন্ত্রী বলেন, কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের বেতন ও ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের কষ্ট তিনি বুঝতে পারেন। তাই সংকট কাটাতে সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আগামী সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ২০২৯ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পূর্ণাঙ্গ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জাতির সামনে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করবেন বলেও তিনি জানান।

সিপিডির সিনিয়র গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বলেন, দেশে জ্বালানি সংকট এখন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। মূলত অতিরিক্ত আমদানি-নির্ভরতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ৮৪ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এর ফলে আমদানির চাপ ও বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় দুটোই বাড়ছে। পরিস্থিতি সামলাতে জরুরি ভিত্তিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার সুপারিশ করেন তিনি। পাশাপাশি আমদানিকৃত জ্বালানির মূল্য ওঠানামা সামলাতে ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দিতে সুনির্দিষ্ট নীতির আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। তিনি বলেন, এই সংকটের ফলে শিল্পখাত গভীর বিপর্যয়ে পড়েছে। সংকট বড় করে প্রচার হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। উচ্চ হারে বিল দিয়েও সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। শিল্পে গ্যাস সরবরাহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং জরুরি সুরক্ষা বা “রেসকিউ প্যাকেজ” দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানি খাতের টেকসই সমাধানে সাময়িক পদক্ষেপের বদলে ১০ বছর মেয়াদি সমন্বিত নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, সঠিক বাজারভিত্তিক মূল্যনীতি এবং নির্ধারিত লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির অভাবে সংকট আরও গভীর হয়েছে। শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে অতীতের সুশাসনের অভাব ও সংস্কারহীনতা দূর করে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে দেশের একটি বড় অংশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র টানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। দেশীয় কূপে উৎপাদন দ্রুত কমতে থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। নতুন ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ সময়সাপেক্ষ হওয়ায় তিনি দ্রুত স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের ওপর জোর দেন। বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়ে বলেন, পোর্টের খালাসপ্রক্রিয়া সহজ করা, স্টোরেজ প্রযুক্তিতে শুল্কছাড় দেওয়া এবং ১৩ লাখ ডিজেলচালিত সেচপাম্পকে সৌরশক্তিতে রূপান্তর করলে দ্রুত সাশ্রয় সম্ভব। জ্বালানি-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন সরকারের অতিরিক্ত সামাজিক প্রতিশ্রুতি, সঠিক মূল্যনীতির অভাব ও সিস্টেম লসকে দায়ী করে বলেন, বছরের পর বছর সংকট জমিয়ে রেখে আজ এ পর্যায়ে আনা হয়েছে। কেবল সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা নয়, চাহিদা নিয়ন্ত্রণেও জোর দিতে হবে। বাস্তবভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ও চুরি বন্ধের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি শিল্পখাতকে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর শিল্পে জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের স্পষ্ট অগ্রাধিকারের দাবি জানান। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। লোডশেডিংয়ের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ ও সিস্টেম লস কমানোর তাগিদ দেন তিনি। আরও বক্তব্য দেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা প্রমুখ। মন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষাংশে পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, সংকট কাটাতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খোলা হবে।