গতকাল থেকে সারা দেশে বিপণিবিতান, বাজার ও দোকানপাট খোলার নতুন সময়সূচি কার্যকর হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যাবে। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার পর সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ করতে হবে এবং সব ধরনের আলোকসজ্জা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ আরও কমেছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে গ্যাস আমদানি হয়। মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট এবং দেশীয় কোম্পানি সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে অক্ষত বয়লারটি থেকে বৃহস্পতিবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে; ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালু করতে এখনো কাজ চলছে। অন্যদিকে সামিটের টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সোমবার সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়। গতকাল বুধবার এটি ১০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে আসে। আবহাওয়ার উন্নতি না হলে সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এক সময় এলএনজির সরবরাহ ১০৫ কোটি ঘনফুট ছিল, যা বর্তমানে প্রায় ৪০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে গতকাল দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২০৩ কোটি ঘনফুট, যেখানে চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গত রোববার ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট, সোমবার ৩ হাজার ৭৫৭, মঙ্গলবার ৩ হাজার ৪৬৫ এবং গতকাল বুধবার ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। গত ১১ আগস্ট রাত ১২টায় সারা দেশে মোট ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট; এর মধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৪ মেগাওয়াট। ঢাকায় ডিপিডিসি ও ডেসকো চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও রাতে কিছু এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি বেশি গুরুতর।
জ্বালানিসংকটে বিদ্যুৎ–বিভ্রাট বেড়ে যাওয়ায় জনরোষও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিছু স্থানে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এ অবস্থায় দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে নিরাপত্তা জোরদার করতে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, অত্যধিক লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে এবং উপকেন্দ্র ও অফিসগুলোর নিরাপত্তা বাড়ানো প্রয়োজন। অন্তত তিনটি জেলায়—সৈয়দপুর, নীলফামারী ও কুষ্টিয়া—নেসকো, ওজোপাডিকো ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির স্থানীয় কর্মকর্তারা পৃথকভাবে পুলিশের সহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছেন। সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নীলফামারীতে ছয়টি থানায় চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং পুলিশ টহল অব্যাহত আছে বলে জেলার মহাব্যবস্থাপক ও থানার ওসি জানিয়েছেন। কুষ্টিয়ায় ওজোপাডিকো ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চিঠিতে বলা হয়েছে, এলাকায় ব্যাপক হারে লোডশেডিং করতে হচ্ছে; চাহিদা ১৫৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে মাত্র ৮৫ থেকে ৯৫ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ৬০ থেকে ৭০ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। জেলা পুলিশের মুখপাত্র জানিয়েছেন, নজরদারি রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে মঙ্গলবার গোপালগঞ্জ পুলিশ সুপারকেও নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল।
দেশের ছয়টি বিতরণ সংস্থার মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছায়। ঢাকায় ডিপিডিসি ও ডেসকো সরবরাহ করে। গ্রামাঞ্চলে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি সমিতি এবং কিছু এলাকায় পিডিবি কাজ করে। উত্তরাঞ্চলের শহর এলাকায় নেসকো এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহর এলাকায় ওজোপাডিকো বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামের মানুষের কষ্ট বেশি; কিছু উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতি উন্নত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। শহর ও গ্রামের মধ্যে লোডশেডিংয়ের বৈষম্য কমানোর চিন্তাও করা হচ্ছে। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি আরও বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করতে না পারায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে বারবার দুঃখ প্রকাশ করা হচ্ছে। তিনি জানান, গণ-অভ্যুত্থানের চেতনায় বৈষম্য কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম প্রথম আলোকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার তৃতীয় টার্মিনাল বাতিল না করলে হয়তো বর্তমান পরিস্থিতি এড়ানো যেত। অন্তত ৭ থেকে ১৫ দিনের এলএনজি মজুতের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানিসংকটের জন্য বর্তমান সরকারকে দায়ী করা যাবে না। হামলার শঙ্কা দূর করতে নিরাপত্তা বাড়াতে হবে, মানুষের কাছে তথ্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে এবং বিল থেকে গ্রাহকদের কিছু ছাড় দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার কথা জানানো হয়েছে। তবে আবহাওয়ার উন্নতি না হলে এবং টার্মিনালের মেরামত কাজ সম্পন্ন না হলে ঘাটতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।




