বাংলা কবিতার ইতিহাসে সুকান্ত ভট্টাচার্য এমন এক নাম, যিনি নিছক কবি নন, বরং একটি যুগের বেদনা, স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে কবির কাব্যকীর্তি ও দর্শনকে নতুন করে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। বাংলা কবিতার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতায় তাঁর আবির্ভাব ঘটলেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী — কারণ তিনি তাঁর সময়ের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছিলেন এক অনন্য কাব্যিক ভাষায়।

বিশ শতকের শুরু থেকেই বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, স্বদেশি চেতনা এবং ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের প্রভাবে গণমানুষের মধ্যে নতুন এক জাগরণ সৃষ্টি হয়। এই পরিবর্তনের ঢেউ বাংলা কবিতায়ও পড়ে, যার সূচনা করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল তাঁর কবিতায় সাম্য, স্বাধীনতা ও বিদ্রোহের যে বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, তার পথ ধরেই এগিয়ে এসেছিলেন সুকান্ত। তবে নজরুলের উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও সহানুভূতির জায়গা থেকে সরে গিয়ে সুকান্তের কবিতা পৌঁছে গিয়েছিল মার্ক্সীয় শ্রেণিসংগ্রামের সুস্পষ্ট চেতনায়।

রাজনৈতিক মতাদর্শের এই পার্থক্যই সুকান্ত ও নজরুলের কাব্যনন্দনের মধ্যে মূল ব্যবধান তৈরি করেছে। সুকান্ত যখন কৈশোরে পা দেন, তখন বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক ভিত্তি অনেকটাই মজবুত হয়ে গিয়েছিল। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ফলে তাঁর কবিতায় শোষক-শোষিত, শত্রু-মিত্রের সম্পর্ক অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর প্রতিটি কবিতায় বঞ্চিত মানুষের হাহাকার, রক্ত এবং বিপ্লবের দীপ্তি ফুটে ওঠে — তবে এই বঞ্চনা কখনোই অসহায়ত্বের প্রতীক নয়, বরং প্রতিরোধের প্রেরণা হয়ে দেখা দেয়।

নিজের কাব্য শুরু করেই সুকান্ত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাওয়ার। তিনি পুরোনো নন্দনতত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন যে, পরিবর্তিত সময়ের সমস্যা সমাধানে পুরোনো জীবনদৃষ্টি অকার্যকর। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা থাকলেও তিনি চেয়েছিলেন নতুন যুগের সঙ্গে সংগতি রেখে রবীন্দ্রনাথের নতুন রূপ দেখা। তিনি বলেছিলেন, ‘এবারে নতুন রূপে দেখা দিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর / বিপ্লবের স্বপ্ন চোখে, কণ্ঠে গণসংগীতের সুর’।

বাংলা মার্ক্সীয় কবিতার ধারায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন, কিন্তু তাঁর কবিতা অনেকের মতে কিছুটা যান্ত্রিক ও তত্ত্বনির্ভর। অন্যদিকে সুকান্ত তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। তিনি আহত হন, ক্ষুব্ধ হন, প্রতিবাদ করেন — কবিতার প্রতিটি লাইনে তাঁর হৃদয়ের স্পন্দন স্পষ্ট। এই সহৃদয় মানবিক উপস্থিতি তাঁকে নজরুলের উত্তরসূরি করে তুলেছে, আবার শ্রেণিসংগ্রামের চেতনায় তিনি পূর্ববর্তী মার্ক্সবাদী কবিদের সগোত্র। এই দুই ধারার মেলবন্ধনেই সুকান্ত বাংলা কবিতায় হয়ে উঠেছেন অতুলনীয়।

সুকান্তের আরেকটি বড় অবদান হলো মার্ক্সীয় কাব্যধারায় নতুন প্রতীক নির্মাণ। ‘চারাগাছ’, ‘সিঁড়ি’, ‘কলম’, ‘আগ্নেয়গিরি’, ‘সিগারেট’, ‘দেশলাই কাঠি’, ‘চিল’, ‘অঙ্কুরিত বীজ’ — এইসব প্রতীকের মধ্যে তিনি এমন কাব্যসম্ভাবনা ও চেতনা সঞ্চার করেছিলেন যা আগে ছিল না। ‘দেশলাই কাঠি’ কবিতায় তিনি নিজেকে এক টুকরো দেশলাইয়ের কাঠির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে জ্বলে ওঠার দুরন্ত উচ্ছ্বাস।

মাত্র একুশ বছর বয়সে তাঁর অকালমৃত্যুকে অনেকে তাঁর কবিতার প্রতি সহানুভূতি পাওয়ার কারণ হিসেবে দেখেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মহাকাল কাউকে ছাড় দেয় না; ইতিহাসে টিকে থাকতে হয় প্রকৃত অবদানের মাধ্যমে। সুকান্ত তাঁর কালের কণ্ঠস্বরকে অনুবাদ করেছিলেন সেই সময়ের আধুনিক কাব্যভাষায়, বাংলা কবিতার বাঁকবদলে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যতদিন মানুষ অসহায় ও শোষিত থাকবে, ততদিন সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত হয়ে থাকবে।