জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সী। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে বলা হচ্ছে জনমিতিক লভ্যাংশ। তবে জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩৩ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে এই সুযোগের সময়সীমা শেষ হয়ে যাবে। তাই এখনই সঠিক নীতি ও কার্যকর বিনিয়োগের মাধ্যমে এই বিরল সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তিতে পরিণত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের সংখ্যা নয়, তাদের দক্ষতাই জনমিতিক লভ্যাংশের মূল শক্তি। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ব্র্যাক, বিআইজিডি এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির যৌথ জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৬ শতাংশ তরুণ নিজেদের ইংরেজি ভাষাজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতায় আত্মবিশ্বাসী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ থাকলেও অনেকের মধ্যে প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের মতো মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে এই বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারায় আনা এবং ইংরেজি, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রোগ্রামিং ও আর্থিক সাক্ষরতা শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলা হয়েছে, ১৯৬০ থেকে ১৯৯০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়া বাধ্যবাধকতামূলক কারিগরি শিক্ষা এবং লক্ষ্যভিত্তিক শিল্প অর্থায়নের মাধ্যমে বার্ষিক ৮ থেকে ১০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। ভিয়েতনামও কারিগরি প্রশিক্ষণকে বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করে ৬.৫ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। বাংলাদেশও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে বলে মত দেওয়া হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং খাত প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার সক্রিয় বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার বছরে ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বৈদেশিক আয় দেশে আনছেন। এই খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দক্ষ ফ্রিল্যান্সারদের প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান ও বৈশ্বিক উদ্যোক্তায় রূপান্তরের জন্য অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তার কথা বলা হয়েছে। ফিলিপাইন ও এস্তোনিয়ার আদলে ডিজিটাল ক্যাশ-ফ্লোভিত্তিক অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড ৫০০ কোটি টাকার ইকুইটি তহবিল পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিউ এন্টারপ্রেনিউরস রিফাইন্যান্স স্কিমে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ পাওয়া যায়। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ তহবিল। বিভিন্ন সহায়তা স্কিম থাকলেও তথ্যের অভাব ও জটিল আবেদনপ্রক্রিয়ার কারণে অনেক উদ্যোক্তা বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল অর্থায়ন প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিদেশগামী কর্মীদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বর্তমানে বেশিরভাগ তরুণ স্বল্পদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাচ্ছেন এবং দালালনির্ভরতার কারণে ঝুঁকির শিকার হচ্ছেন। বিএমইটিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতা উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলা এবং জাপান বা জার্মানির প্রশিক্ষণ মডেলের সঙ্গে দেশীয় কারিগরি শিক্ষাকে সমন্বয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে যাচাইকৃত কর্মচুক্তির ভিত্তিতে দ্রুত ও জামানতবিহীন অভিবাসন ঋণ চালু এবং জিটুজি জনশক্তি প্রেরণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
কৃষি ও কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, ব্লু ইকোনমি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং ফুলচাষের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে আম, হলুদ, মসলা ও ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। কাঁকড়া, ঝিনুক ও শামুক চাষের মতো উচ্চমূল্যের খাতকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানোকে অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ছিল ৪১.৫ শতাংশ। তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মসংস্থানের ধরন বদলে যাওয়ায় তরুণ নারীদের প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতায় প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। লেখকের মতে, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, প্রযুক্তি, কৃষি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান—সবকিছুকে একটি সমন্বিত জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের আওতায় আনতে হবে। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সুসংহত পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন।


