শিক্ষা ও আলোকিত হওয়া—এই দুই ধারণার মধ্যে দূরত্ব আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হলেও, অন্তরালের ব্যবধানটি বেশ গভীর। প্রশ্ন হলো, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই কি মানুষকে আলোকিত করে, নাকি যার অন্তরে জ্ঞানের আলো জ্বলে ওঠে, তিনিই প্রকৃত শিক্ষিত? দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকেই এই পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন, কিন্তু তাঁর আচরণ বা কথাবার্তায় জীবনের প্রতি চরম হতাশা ও আত্মদহন ফুটে ওঠে। চারপাশের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত ক্ষুব্ধ থাকেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চূড়ায় পৌঁছেও জীবন থেকে ইতিবাচক অর্থ খুঁজে নিতে না পারা প্রমাণ করে, তিনি হয়তো বিদ্যা অর্জন করেছেন কিন্তু আলোকিত হতে পারেননি।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর 'গুহার রূপক' এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। অন্ধকার গুহায় শৃঙ্খলিত মানুষগুলো দেয়ালে প্রতিফলিত ছায়াকেই সত্য বলে বিশ্বাস করে। শিক্ষা যখন সেই শৃঙ্খল ভেঙে দেয়, তখন মানুষ গুহার বাইরে বেরিয়ে এসে প্রকৃত সত্যের সূর্যালোক দেখতে পায়। আলোকিত হওয়ার মূলমন্ত্র লুকিয়ে আছে পারস্পরিক সান্নিধ্যের প্রেরণায়। একজন আলোকিত মানুষের সংস্পর্শে এলে হতাশাগ্রস্ত মানুষও পথ চলার সাহস পায় এবং মনে নতুন শক্তি সঞ্চার হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'শিক্ষার হেরফের' প্রবন্ধে শিক্ষার এই জাগরণী শক্তির কথা বলেছেন। তাঁর মতে, প্রদীপ থেকে যেমন আরেকটি প্রদীপ জ্বালানো যায়, তেমনি একটি মন থেকে অন্য মনকে জাগিয়ে তোলা যায়। আলোকিত মানুষ সর্বদা চান অন্যের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হোক। ব্যর্থতার জন্য অনুযোগ করার বদলে তিনি বর্তমান মুহূর্তকে কাজে লাগাতে ভালোবাসেন। মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও, তাৎপর্যপূর্ণ করে তুললে তা অসীম বিশাল হয়ে ওঠে।

সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী তাঁর 'বই পড়া' প্রবন্ধে গণতন্ত্র ও শিক্ষার সম্পর্ক নিয়ে বলেছেন, গণতন্ত্র শিক্ষার সার্থকতা বোঝে না, বোঝে শুধু ফল। তিনি মনে করেন, শিক্ষা কাউকে দেওয়া যায় না, স্বশিক্ষিত হওয়াই единственный উপায়। মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে নিজের অসীম ক্ষমতা উপলব্ধি করতে শেখানোই বিদ্যার আসল কাজ। মানুষের পক্ষে বিশ্ব ও জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব; কারণ মানুষের ভেতরেই লুকিয়ে আছে অনন্ত সম্ভাবনা। নিজের অস্তিত্ব, পৃথিবী এবং চারপাশের জীবন সম্পর্কে এই অভিনব জাগরণই বিদ্যার মহত্তম দান। এই সুচেতনাকেই আমরা বলছি আলোকিত হওয়া। এই আলোর স্পর্শে যাঁদের চেতনা জাগ্রত হবে, তাঁরাই সমাজকে পথ দেখাবেন। তাই কেবল তথ্য সংগ্রহকারী না হয়ে অন্তরকে আলোকিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।