ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর খাদ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থী রাফি হাওলাদার রাতের খাবারে পুঁইশাক ও মুরগির তরকারির মধ্যে একটি কেঁচো দেখতে পান। তাঁর ভাষ্য, প্রথমে অদ্ভুত পোকা মনে হলেও পরে অন্য শিক্ষার্থীরা নিশ্চিত করেন এটি একটি কেঁচো। এ ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক হলে একই ধরনের অভিযোগ জমা পড়েছে।

গত ৫ জুলাই শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রধান ক্যানটিনের তরকারিতে ধারালো ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ করেন এক শিক্ষার্থী। হল সংসদ ক্যানটিনটি সাময়িক বন্ধ করলেও কয়েক দিন পর পুনরায় চালু হয়। চালুর পর ২৩ জুলাই তেলাপোকা এবং ২৫ জুলাই কেঁচো পাওয়ার ঘটনা ঘটে। জসীমউদ্‌দীন হলের ক্যানটিনেও ১৬ জুলাই ব্লেড পাওয়া যায়, যার দায় স্বীকার করায় পরিচালনাকারীকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই হলের খাবারে আগে জোঁক পাওয়ার নজিরও রয়েছে। বিজয় একাত্তর হলের ক্যানটিনে ২০ জুলাই পোকা পাওয়ার অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।

শুধু অখাদ্য বস্তু নয়, নিম্নমানের খাবার খেয়েও শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হচ্ছেন। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মামুন সরকার জানান, হলের মুরগি ও সবজি খেয়ে তিনি তীব্র পেটব্যথায় আক্রান্ত হন। চিকিৎসকের পরামর্শে ফুড পয়জনিং ধরা পড়ে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হলেও এখন আর হলের খাবার খেতে চান না, কিন্তু বাইরের খাবারের উচ্চ মূল্যের কারণে বাধ্য হয়ে ক্যানটিনের অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করেন।

সরেজমিনে জরিপে দেখা গেছে, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, সূর্য সেন হল, জিয়াউর রহমান হল ও কবি জসীমউদ্‌দীন হলের ক্যানটিনে অস্বাস্থ্যকর ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে রান্না চলছে। রান্না করা মুরগি ও মাছ খোলা রাখা, বাবুর্চিদের আলাদা পোশাক না থাকা এবং স্বাস্থ্যবিধির অভাব চোখে পড়েছে। ক্যানটিন ব্যবস্থাপকরা বাজারদরের ঊর্ধ্বগতিকে দায়ী করলেও শিক্ষার্থীরা তদারকি ও জবাবদিহির অভাবকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

খাবারের মূল্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভাত-মুরগি ৪৫-৫০ টাকা, ভাত-মাছ ৫০-৬০ টাকা এবং সবজি ৫-১০ টাকা। অথচ ক্যাম্পাসের বাইরের হোটেলে একই খাবারের দাম ৩০-৫০ টাকা বেশি। তবে দাম বেশি হলেও মান ও পরিমাণ তুলনামূলক ভালো। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পক্ষে নিয়মিত বাইরে খাওয়া সম্ভব না হওয়ায় তারা হলের ক্যানটিনের ওপর নির্ভরশীল।

পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আবু তোরাব মোহাম্মদ আবদুর রহিম জানান, একজন শিক্ষার্থীর দৈনিক ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ ক্যালরি প্রয়োজন, যা হলের খাবারে পাওয়া যায় না। শুধু ভাত খেয়ে এ চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়, প্রয়োজন প্রোটিন, চর্বি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। ব্যবহৃত উপকরণ সাধারণত বাজারের নিম্নমানের। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের পক্ষে পুষ্টিকর খাবার কেনা সম্ভব নয়, ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও বেশি দামে মানসম্মত খাবার কেনার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

এ অবস্থায় ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ী ছাত্রশিবির-সমর্থিত 'ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট' তাদের ইশতেহারে চিকিৎসাসুবিধা ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেছিল। তারা পুষ্টিবিদের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যের মেনু, তিন মাস পরপর খাদ্যমান পরীক্ষা, নতুন ক্যাফেটেরিয়া এবং আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য 'মিল ভাউচার' চালুর প্রতিশ্রুতি দেয়। ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ জানান, নিয়মিত ক্যানটিন পরিদর্শন করা হচ্ছে, তবে প্রশাসনের অনুমতি ও অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় পুষ্টিবিদ বা সরকারি খাদ্য পরীক্ষক দিয়ে খাবারের মান পরীক্ষা শুরু করা যায়নি। আর এক সপ্তাহের মধ্যে অগ্রগতি না হলে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, কেঁচো, ব্লেড, তেলাপোকা ও কাঁকড়া পাওয়ার অভিযোগের পর সব প্রভোস্টকে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়া হলগুলোতে তদন্ত চলছে এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের দাম কমাতে টিসিবির মাধ্যমে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী স্বল্পমূল্যে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া এক হাজার কোটি টাকার এন্ডোমেন্ট ফান্ড থেকে ক্যানটিনে ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।