বাংলাদেশে গোপন অপহরণের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থ হতে পারে সাম্প্রতিক একটি খসড়া আইন—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। দলটির মূল্যায়নে, প্রস্তাবিত এই বিধিমালা দোষমুক্তির প্রচলিত ধারাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং অস্বীকারের সংস্কৃতিকে দীর্ঘায়িত করবে। গত ৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মন্ত্রিসভা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া, ২০২৬’ অনুমোদন করেছে। কিন্তু এই আইনের ১৪ ধারায় এমন একটি তদন্ত পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা কার্যত অভিযুক্ত বাহিনীগুলোকে নিজেদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ যাচাইয়ের ক্ষমতা প্রদান করছে।

খসড়ার ১৪ ধারার বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি গুমের অভিযোগ করতে চাইলে তাকে প্রথমে থানায় যেতে হবে। পরবর্তীতে সেই অভিযোগের তদন্তের দায়ভার নেবে পুলিশ। অথচ প্রস্তাবিত আইনের অন্যান্য অংশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌ ও বিমানবাহিনী, র‍্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার এবং সরকারের গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থার সদস্যরা গুমের ঘটনায় জড়িত হতে পারে। ফলে যেসব বাহিনী ও সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে, তদন্তের নিয়ন্ত্রণও কার্যত তাদেরই হাতে থাকবে। আজ বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এনসিপির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা এই বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। বিবৃতিতে দলটি নতুন খসড়াকে ‘গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

এই তদন্তব্যবস্থার সরাসরি ফলাফল হিসেবে দলটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কোনো পরিবার যদি পুলিশের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ দায়ের করে, তবে পুলিশই সেই অভিযোগ তদন্ত করে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পাবে। এরপর যদি তদন্তের ফলাফলে অভিযোগটি মিথ্যা হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে অভিযোগকারী পরিবারকে সশ্রম কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হতে পারে। এর ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা অভিযোগ করতে ভয় পাবেন এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও সংকুচিত হবে। এনসিপি জোর দিয়ে বলেছে, মিথ্যা অভিযোগের জন্য শাস্তির বিধানটি মূল সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হলো, অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজেদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া। এই কাঠামোর কারণে দোষীরা জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে জারি করা গুম-সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি বর্তমান সরকার এপ্রিলে বিলুপ্ত করেছে। ফলে নতুনভাবে সংঘটিত গুমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো আইনি সংজ্ঞা বিদ্যমান নেই। তাই একটি কার্যকর আইন প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু উন্নত ও শক্তিশালী আইনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও সরকার মূলত একটি দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ কাঠামো তৈরি করেছে বলে এনসিপি মন্তব্য করেছে। দলটির মতে, স্বাধীন তদন্তব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে এই আইনের মাধ্যমে দোষীদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা সম্ভব হবে না; বরং এটি দোষমুক্তির একটি নতুন হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার দিকটিও বিবৃতিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ‘গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ’-এ যোগ দিয়েছে। ওই সনদের ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গুমের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। জাতিসংঘের গুমবিষয়ক কমিটিও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কোনো বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে সেই বাহিনী তদন্তে অংশ নিতে পারবে না। এনসিপি বলেছে, খসড়া আইনের ১৪ ধারা এই ন্যূনতম আন্তর্জাতিক মানদণ্ডও পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

দলের পক্ষ থেকে দুটি প্রধান দাবি উত্থাপিত হয়েছে। প্রথমত, খসড়া আইনের ১৪ ধারার সংশোধন। দ্বিতীয়ত, গুমের প্রতিটি অভিযোগ পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইনে তালিকাভুক্ত অন্যান্য বাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’-এর বাইরে থাকা একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করানো। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রশিক্ষিত তদন্ত ইউনিটকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সরকার এপ্রিলে সেই অধ্যাদেশ বিলুপ্ত করায় সেই ব্যবস্থাও কার্যত হারিয়ে গেছে। এনসিপি সেই ব্যবস্থাটি ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানিয়েছে। অথবা সরকারকে এমন একটি সত্যিকার স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠন করতে হবে, যেখানে পুলিশ, সামরিক, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা ও সক্ষমতা থাকবে। দলটির মতে, গুমবিরোধী আইন কখনোই অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যাচাই করতে বলতে পারে না। স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা ছাড়া এই খসড়া আইন দোষমুক্তির অবসান ঘটাবে না; বরং তা টিকিয়ে রাখবে এবং আরও গভীর করবে।