বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব চলাকালে ফুটবলারদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে শারীরিক ও মানসিক সতেজতা বজায় রাখা। প্রতিটি ম্যাচের পর পেশির শক্তি হ্রাস পায়, পানিশূন্যতা দেখা দেয় এবং পায়ে ভারী ভাব আসে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ম্যাচের পর পুরোপুরি সুস্থ হতে কয়েক দিন লেগে যায়। তবে শারীরিক ক্লান্তির চেয়ে মানসিক চাপ মোকাবিলা করা আরও জটিল। ২০২৬ বিশ্বকাপে উত্তর ও মধ্য আমেরিকা জুড়ে ভ্রমণের কারণে খেলোয়াড়দের একাধিক টাইম জোন পাড়ি দিতে হচ্ছে। মায়ামি বা মন্তেরেইয়ের গরম থেকে মেক্সিকো সিটির উচ্চতা—প্রতি নতুন গন্তব্যে মানিয়ে নিতে হচ্ছে নতুন করে। বারবার উড়োজাহাজে চড়ার ফলে জেট ল্যাগ দেখা দেয়, যা ঘুম ও সতর্কতায় ব্যাঘাত ঘটায়। ফরাসি ফরোয়ার্ড রায়ান চেরকি জানান, উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর পর তাঁর মনে হয়েছে যেন রাতটা দশকব্যাপী স্থায়ী ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ব দিকে ভ্রমণে প্রতি টাইম জোনের জন্য এক দিন এবং পশ্চিম দিকে অর্ধেক দিন সময় লাগে শরীরকে মানিয়ে নিতে।

ভ্রমণক্লান্তি জেট ল্যাগের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। ম্যাচ, শহর ও পরিবেশের মধ্যে বারবার যাতায়াতের ফলে ক্লান্তি জমতে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ক্লান্তি মূলত ঘুম, শরীরের ব্যথা ও মানসিক চাপের ওপর প্রভাব ফেলে, মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে বেশি। ক্রোয়েশিয়ার সাবেক তারকা ইভান রাকিতিচ বলেন, ভ্রমণই সবচেয়ে বিরক্তিকর—পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা প্লেনে কাটানো, তার আগে বাসে করে বিমানবন্দরে যাওয়া—সব মিলিয়ে সময় নষ্ট হয়। তিনি মজা করে বলেন, স্পেনে কাটানো ১৩ বছরে তিনি দুপুরে ঘুমাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন, কিন্তু বিশ্বকাপের ভ্রমণে সেই অভ্যাস বজায় রাখা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে ফরাসি ডিফেন্ডার বাকারি সানিয়া ভ্রমণকে উপভোগ করেন। তাঁর মতে, প্লেনে নিজের মতো জায়গা পাওয়া যায়, ঘুমানো যায় এবং দলের মধ্যে বন্ধন তৈরি হয়। তবে অধিকাংশ খেলোয়াড়ের কাছে এটি কষ্টকর।

ইংল্যান্ড দল এই সমস্যা মোকাবিলায় একটি অদ্ভুত কৌশল নিয়েছে। নকআউট পর্বে তারা প্রতিটি ম্যাচের পর নিজেদের বেজক্যাম্প কানসাস সিটিতে ফিরে যায়। এতে তাদের ভ্রমণ দূরত্ব ৪৩ শতাংশ বেড়ে গেলেও, চেনা বিছানা ও টাইম জোনে থাকার সুবিধা পায় তারা। ঘুম ও পুনরুদ্ধার বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. শেনিয়া হ্যালসন বলেন, বারবার টাইম জোন বদলানোর চেয়ে একই জোনে থাকা শরীরের জন্য ভালো, এমনকি এক-দুই ঘণ্টার পার্থক্য হলেও। রাকিতিচও মনে করেন, ক্যাম্পকে বাড়ির মতো করে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। তবে জার্মানির সাবেক পারফরম্যান্স স্টাফ ডার্সি নরম্যানের মতে, ভ্রমণকে বড় সমস্যা ভাবলে তা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়; স্বাভাবিকভাবে নিলে কোনো সমস্যা হয় না।

শারীরিক ক্লান্তির পাশাপাশি মানসিক ক্লান্তিও বড় চ্যালেঞ্জ। সাত-আটটি ম্যাচ খেলার কারণে খেলোয়াড়রা যতটা ক্লান্ত হন, তার চেয়ে বেশি ক্লান্ত হন অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা, প্রস্তুতি, বিশ্লেষণ ও সতীর্থদের খেয়াল রাখার চাপে। ম্যাচের পর পেশির এনার্জি ও পানিশূন্যতা দ্রুত ঠিক হলেও পেশির ব্যথা ও ক্ষত সারাতে বেশি সময় লাগে। ফলে অনেক সময় শরীর পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই পরবর্তী ম্যাচ খেলতে নামতে হয়। দলের ডাক্তার, ফিজিও ও পারফরম্যান্স স্টাফরা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। রাকিতিচ বলেন, মাঠের বাইরের এই দলটি কখনও কখনও মাঠের খেলোয়াড়দের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পুষ্টি, পানি পান ও ভালো ঘুম পুনরুদ্ধারের মূল ভিত্তি। ইউরোপের শীর্ষ রেস্ট অ্যান্ড রিকভারি বিশেষজ্ঞ আন্না ওয়েস্ট জানান, ঘুম শুধু রাতে নয়, সারাদিনের রুটিনের ওপর নির্ভর করে। জার্মানির হেড অব পারফরম্যান্স নিকলাস ডিট্রিচ বলেন, তারা প্রথমে বিশ্বকাপের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করেন এবং তারপর সমাধান খোঁজেন।

ম্যাচের ব্যবধান নিয়েও রয়েছে ভিন্ন মত। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী জার্মান তারকা পার মার্টেস্যাকার বলেন, চার দিনের গ্যাপ থাকলে ফোকাস ঠিক থাকে, কিন্তু বেশি গ্যাপ হলে অতিরিক্ত চিন্তাভাবনার সুযোগ তৈরি হয়। রাকিতিচ প্রতি তিন-চার দিন পরপর ম্যাচ খেলতেই পছন্দ করেন। ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার ক্যাম্পের পরিবেশ এতটাই দারুণ ছিল যে তিনি দলের ডাক্তার জোরান বাহতিয়ারেভিচকে বলেছিলেন, বাড়ি ফিরে গেলে তাঁকে মিস করবেন। ডাক্তার সারা রাত জেগে রাকিতিচের সেবা করেছিলেন সেমিফাইনালের আগের রাতে তাঁর অসুস্থতায়। দুজনের আস্থার কারণে রাকিতিচ মাঠে নামেন এবং ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হন। নিকলাস ডিট্রিচ মনে করিয়ে দেন, সবকিছু নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়; খেলোয়াড়দেরও তা বুঝতে হবে। বিশ্বকাপে সতেজতা মানে শুধু পায়ের শক্তি নয়, বরং মস্তিষ্কের শক্তি, পারস্পরিক সম্পর্ক ও দলীয় মানসিকতা। ২০১৮ সালের ফাইনালের আগে রাকিতিচ বলেছিলেন, 'আমি এখন একটা মেশিন, কারণ আমি এখানে এসেছি একটা স্বপ্নের জন্য।' বিশ্বকাপ হয়তো অনেক কিছু কেড়ে নেয়, কিন্তু দিন শেষে এই অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও রোমাঞ্চটাই ফুটবলারদের ফিরিয়ে দেয়।