সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজধানীর গুলশান এলাকার ১৯৬ নম্বর বাসগৃহকে 'বিশেষ শ্রেণির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা' (কেপিআই) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গত ১৬ জুন এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর আগে ৭ জুন কেপিআই ডিফেন্স কমিটির (কেপিআইডিসি) মাসিক সভায় ভবনটিকে বিশেষ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের কার্যালয় ও বাসগৃহ বিশেষ শ্রেণির কেপিআই হিসেবে বিবেচিত হয়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর গুলশানের এই বাড়িতে ওঠেন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ব্যবহার না করে এখনো এখান থেকেই সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। পূর্ববর্তী সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসস্থান ছিল গণভবন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর বিক্ষুব্ধ জনতা গণভবনে ভাঙচুর চালায়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার সেই ভবনকে 'জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর' হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়, যা এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়।
গুলশানের ওই বাড়িটির মালিকানা প্রসঙ্গে জানা যায়, ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর প্রায় দেড় বিঘা জমির ওপর নির্মিত ওই বাসস্থান তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেয়া হলেও নামজারি ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের ৫ জুন খালেদা জিয়ার নামে নামজারি সম্পন্ন হয়। পরবর্তী সময়ে বাড়িটি সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়।
কেপিআই বলতে এমন স্থাপনা বা অবকাঠামো বোঝায়, যার নিরাপত্তা রাষ্ট্রের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের যুদ্ধসামর্থ্য, প্রতিরক্ষা বা অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বঙ্গভবন, সচিবালয়, জাতীয় সংসদ, বিমানবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো স্থাপনা কেপিআই তালিকায় রয়েছে। কেপিআই নির্ধারণ ও ঘোষণা দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ১৯৯৭ সালে প্রণীত নির্দেশনা ২০১৩ সালে হালনাগাদ করে 'কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা-২০১৩' জারি করা হয়।
বিশেষ শ্রেণির এই স্থাপনার জন্য নীতিমালায় কঠোর নিরাপত্তাবিধি বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সীমানাপ্রাচীর হবে ১২ ফুট উঁচু, তার ওপরে ৩ ফুট 'ওয়াই' আকৃতির কাঁটাতার। সীমানা থেকে ২৫ মিটারের মধ্যে কোনো ভবন নির্মাণ নিষিদ্ধ। ১৫০ মিটারের মধ্যে দুই তলার বেশি ভবন নির্মাণ করা যাবে না। ১৫০ থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে ২৫ ফুটের বেশি উঁচু ভবন নির্মাণে কেপিআইডিসির মতামত নিতে হবে। বঙ্গভবন, গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সরকারি বাসভবনের ৫০০ মিটারের মধ্যে ৮.৭৫ মিটারের বেশি উঁচু ভবন নির্মাণে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ছাড়পত্র প্রয়োজন।
বাসভবনটিকে 'নো ফ্লাইং জোন' ঘোষণা করা হবে। সীমানাপ্রাচীরের কাছাকাছি ১৫-২০ ফুট উচ্চতার প্রহরাচৌকি বসানো হবে, যেখানে সশস্ত্র প্রহরী বাইনোকুলার নিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি করবেন। এনএসআই, ডিজিএফআই ও এসবির সমন্বয়ে গঠিত একটি ইন্টেলিজেন্স সেল নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য এসএসএফকে সরবরাহ করবে। প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। ভবনের প্রবেশপথের সংখ্যা কমিয়ে জরুরি পথ সিলগালা রাখতে হবে। সাক্ষাৎপ্রার্থীদের জন্য পাস ইস্যুর ব্যবস্থা থাকবে। অনুমতি ছাড়া এই এলাকায় কেউ ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে পারবেন না। রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং সীমানাপ্রাচীরের কাছাকাছি থাকা গাছপালা, বৈদ্যুতিক ও টেলিফোনের পোস্ট সরিয়ে ফেলতে হবে। কেপিআইয়ের ওপর দিয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক তার বা ফ্লাইওভার নির্মাণ নিষিদ্ধ। নিরাপত্তার স্বার্থে সীমানা থেকে ৩০ মিটারের মধ্যে কোনো সুড়ঙ্গপথ তৈরি করা যাবে না এবং গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি থাকবে বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে।




