বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) সম্প্রতি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগের সঙ্গে ওভার দ্য টপ (ওটিটি) প্ল্যাটফর্মের খরচ একীভূত করার বিষয়ে ভাবনা চালাচ্ছে। এই লক্ষ্যে দুটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের (আইএসপি) কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর তা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে এবং একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিটিআরসির নথি অনুযায়ী, নেশনওয়াইড আইএসপি রেস অনলাইন লিমিটেড ও আইসিসি কমিউনিকেশন লিমিটেড — এই দুই প্রতিষ্ঠান নিজেদের অনুমোদিত ইন্টারনেট প্যাকেজের সঙ্গে ওটিটি স্ট্রিমিংসহ অন্যান্য ডিজিটাল সেবা বান্ডেল করার অনুমতি চেয়েছে। রেস অনলাইনের ‘অরবিট ইন্টারনেট প্যাকেজ’ শীর্ষক প্রস্তাবটিতে ৫ জুলাই নির্দিষ্ট গতির ইন্টারনেটের সঙ্গে টকটাইম, ই-হেলথ সুবিধা এবং বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০ এমবিপিএস গতির ৫০০ টাকার প্যাকেজে ৫০ মিনিট টকটাইম ও ই-হেলথ সুবিধা থাকবে; ৩৫ এমবিপিএসের ৬০০ টাকার প্যাকেজে যুক্ত হবে ‘বঙ্গ’ ওটিটি সেবা; ১০০ এমবিপিএসের ১ হাজার টাকার প্যাকেজে থাকবে ‘বঙ্গ’ ও ‘চরকি’; আর সর্বোচ্চ ৬৫০ এমবিপিএসের প্যাকেজে ওটিটি সেবার পাশাপাশি টকটাইমের পরিমাণও বাড়বে।
অন্যদিকে, আইসিসি কমিউনিকেশন একটি ভিন্ন মডেলের প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের মডেলে গ্রাহক কতটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেবেন তার ওপর প্যাকেজের দাম নির্ভর করবে। যেমন — একটি ওটিটিসহ ৩০ এমবিপিএসের প্যাকেজের দাম ৮০০ টাকা, আর পাঁচটি ওটিটিসহ ৮০ এমবিপিএসের প্যাকেজের দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা। সম্ভাব্য ওটিটির তালিকায় চরকি, বঙ্গ, আয়না, দীপ্ত, আই স্ক্রিন, টফি, বায়োস্কোপ+সহ দেশীয় প্ল্যাটফর্ম এবং নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, সনি লিভ, হইচই, ট্যাপ ম্যাডের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের নাম রয়েছে।
দুটি আইএসপির প্রস্তাবের ধরন ভিন্ন হওয়ায় বিটিআরসি মনে করছে, এক-দুটি প্রতিষ্ঠানের আবেদন নিষ্পত্তি না করে সব আইএসপির জন্য একটি অভিন্ন নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, এ সুযোগ নিশ্চিত করতে কোনো একক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিটিআরসি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, মোবাইল অপারেটর, আইএসপিসহ অন্যান্য সেবাদাতাদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করতে হবে।
কমিশনের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক প্রস্তাবে দেশি ও বিদেশি ওটিটির ক্ষেত্রে আলাদা নীতির কথা বলা হয়েছে। দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে কমিশনের অনুমোদিত ট্যারিফের সিলিং প্রাইসের মধ্যে বান্ডেল করতে আইএসপিদের আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। তবে বিদেশি ওটিটি বা অন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বান্ডেল করতে প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য কমিশনের অনুমোদন নিতে হবে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আইনগত অবস্থান, কর ও রাজস্ব পরিশোধ, বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ লেনদেন এবং রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়গুলো যাচাই করা হবে। এছাড়া ই-হেলথ, ই-এডুকেশন, ই-অ্যাগ্রিকালচারের মতো সামাজিক সেবামূলক প্ল্যাটফর্মগুলোকে বিনোদনভিত্তিক ওটিটি থেকে আলাদা রাখা হয়েছে এবং সেগুলোও আলাদা অনুমোদনের আওতায় থাকবে।
মোবাইল অপারেটররা দীর্ঘদিন ধরে ডিরেক্ট অপারেটর বিলিং ও ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসের মাধ্যমে ওটিটি সেবা দিয়ে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে সমতাভিত্তিক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে আইএসপিদেরও একই সুযোগ দেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন বিটিআরসির কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, এতে গ্রাহকরা আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল সেবা পাবেন। বিটিআরসির চেয়ারম্যান আরও বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব এবং ক্ষতিকর নয় — এমন সবকিছু গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থাকা উচিত।
ইন্টারনেটের সঙ্গে ওটিটি বান্ডেল করার চর্চা বিশ্বের বহু দেশে রয়েছে। ভারতে রিলায়েন্স জিও ও ভারতী এয়ারটেল বিভিন্ন ব্রডব্যান্ড ও পোস্টপেইড প্যাকেজে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, জিওহটস্টার যুক্ত করছে। রিলায়েন্স জিওর মাসিক ৮৮৮ রুপির ফাইবার প্যাকেজে ৩০ এমবিপিএস গতির আনলিমিটেড ইন্টারনেটের সঙ্গে ১৫টি ওটিটি সেবা দেওয়া হচ্ছে। ভারতী এয়ারটেলের ৯৯৯ রুপির প্যাকেজে ১০০ এমবিপিএস গতির সঙ্গে নেটফ্লিক্স, অ্যাপল টিভি প্লাস, প্রাইম ভিডিওসহ ২০টির বেশি ওটিটি সেবা রয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ কোরিয়াতেও একই ধরনের বান্ডেল প্রচলিত।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে চার ক্যাটাগরিতে ২ হাজার ৮০৪টি প্রতিষ্ঠানের আইএসপি লাইসেন্স রয়েছে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, অবৈধ মিলিয়ে এই সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি। প্রাথমিক পরিকল্পনাটি নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি কয়েকটি প্রশ্নও তুলেছে। যেমন — ওটিটি অংশের মূল্য নির্ধারণে আলাদা কোনো নীতির উল্লেখ নেই, ফলে ব্রডব্যান্ডের নামে অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের সুযোগ থাকতে পারে। বান্ডেলে থাকা কনটেন্ট নিয়ে আইনি দায়দায়িত্ব ওটিটি প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তাবে, কিন্তু কোনো আইএসপি যদি অননুমোদিত বা বিতর্কিত সেবা যুক্ত করে তাহলে দায় কার হবে সেটিও স্পষ্ট নয়।
প্রাথমিকভাবে বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে আইএসপিদের সংগঠন আইএসপিএবি। সংগঠনটির মহাসচিব নাজমুল করিম ভূঁঞা প্রথম আলোকে বলেন, বিটিআরসি এখনো তাদের সঙ্গে আলোচনা করেনি, তবে উদ্যোগটি ভালো। সম্মিলিতভাবে কাজ করে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা গেলে তা গ্রাহকদের জন্যও মঙ্গলজনক হবে।




