কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যে কর্মক্ষেত্রের চিত্র বদলে দেবে, এ কথা আজকাল প্রায় সবাই স্বীকার করেন। কিন্তু প্রশ্ন যখন নিজের চাকরির কথা আসে, তখন বেশিরভাগ মানুষের উত্তরই হয় দ্বিধান্বিত। এই মানসিকতাকে গবেষকেরা বলছেন 'অভেদ্যতা পক্ষপাত' (Invulnerability Bias) — অর্থাৎ, ঝুঁকিটা বাস্তব জেনেও মনে করা যে তা অন্য সবার জন্য প্রযোজ্য, নিজের জন্য নয়।

নিজের কাজ যে আলাদা, এ বিশ্বাসের পেছনে অবশ্য যুক্তির অভাব নেই। কেউ জানেন তাঁর কাজে কতটা অভিজ্ঞতা দরকার, কাদের উপর নির্ভর করতে হয়, আর চাকরির বিবরণীতে যা লেখা থাকে না, সেই অদৃশ্য দায়িত্বগুলোই বা কী। ফলে অন্য শিল্পে এআই-এর প্রভাবের খবর শুনে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, নিজের অবস্থানটা নিশ্চয়ই ভিন্ন।

সম্প্রতি ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এই পক্ষপাতের পরিমাপ করা হয়েছে। গড়ে মানুষ মনে করেন, সাধারণভাবে অন্যদের কাজের তুলনায় নিজের কাজ এআই-এর প্রভাবে কম পড়বে। তবে এই ধারণার মাত্রা পেশাভেদে ভিন্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পর্যায়ের এক জরিপেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে ৬২ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এআই কর্মীদের উপর বড় প্রভাব ফেলবে; কিন্তু মাত্র ২৮ শতাংশ মনে করেন, এটি তাঁর নিজের কাজেও প্রভাব ফেলবে। অর্থাৎ, একই পরিবর্তনের কথা ভেবে অনেকে সেটাকে অন্যের ক্যারিয়ারের ঘটনা হিসেবে দেখছেন।

গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, যাঁরা এআই সম্পর্কে বেশি জানেন, তাঁদের মধ্যে এই পক্ষপাত কম দেখা যায়। প্রযুক্তির সঙ্গে যাঁদের পরিচিতি বেশি, তাঁরা নিজেদের কাজে এর প্রভাব সহজেই মেনে নিতে পারেন। পেশার দিক থেকেও পার্থক্য স্পষ্ট। স্বাস্থ্যসেবা, আইন ও জনপ্রশাসনে এই পক্ষপাত সবচেয়ে বেশি, আর প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও স্থাপত্যে সবচেয়ে কম — সেখানে মাত্র এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে এটা দেখা গেছে। চিকিৎসক বা আইনজীবীরা যে নিজেদের কাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী, সেটা বোধগম্য; কারণ তাদের কাজে বিচারবুদ্ধি ও বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন, যা যান্ত্রিকীকরণ করা ঐতিহাসিকভাবে কঠিন। কিন্তু এই আত্মবিশ্বাস যে সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত, তা নিশ্চিত নয়।

এআই সম্পর্কে জানার সঙ্গে পক্ষপাতের যে সম্পর্ক, সেটি আসলে একটি শিক্ষণীয় বিষয়। কেউ প্রযুক্তি সম্পর্কে যত বেশি জানেন, নিজের কাজে এর প্রভাব নিয়ে তত কম আত্মতুষ্টিতে থাকেন। প্রশ্ন হলো, নিজের কাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই আত্মবিশ্বাসটা আসে প্রযুক্তিকে বোঝা থেকে, নাকি অন্যের কথা শুনে তৈরি হওয়া ধারণা থেকে? বিজনেস-টু-বিজনেস (বি২বি) মার্কেটিং খাতের এক সমীক্ষাতেও একই চিত্র। ৮২ শতাংশ উত্তরদাতা স্বীকার করেছেন, এআই বিপণনের অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয় করবে; কিন্তু মাত্র ১৫ শতাংশ মনে করেন, এটি তাঁর নিজের কাজের জায়গা নেবে। গোটা শিল্প যখন পরিবর্তনের মুখে, তখন প্রায় প্রতিটি কর্মীই মনে করেন তাঁর কাজটা তার থেকে একটু দূরে।

এ ধরনের দ্বন্দ্ব সাধারণত কোম্পানির ভেতরে ধরা পড়ে না। ব্যবস্থাপনা দল এআই কৌশল তৈরি করে, বোর্ডে উপস্থাপন করে, অর্থ বরাদ্দ করে — কিন্তু সেই কৌশল বাস্তবায়নকারী বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, সেটা কারও অন্য কাজের কথা বলছে।

এড়িয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হলো, বেশিরভাগ কাজ একদিনে বদলায় না। এআই ধীরে ধীরে কাজের অংশগুলো দখল করে নেয়। কোনো রিপোর্ট দ্রুত তৈরি হচ্ছে, যে গবেষণায় ঘণ্টা লেগে যেত তা এখন মিনিটে হচ্ছে — প্রতিটি পরিবর্তন এত ছোট যে সহজেই উপেক্ষা করা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ছোট পরিবর্তনগুলোই এক বিরাট রূপ নেয়। এআই নিয়ে আলোচনাও সাধারণত ‘লক্ষ লক্ষ কাজ’ বা ‘গোটা শিল্প’ প্রসঙ্গে হয়, ফলে পরিবর্তনটা দূরের ও বিশাল মনে হয়, কিন্তু নিজের চেয়ারের দিক থেকে তাকালে তা অদ্ভুতভাবে দূরের।

এই সমস্যাটিকে শুধু আত্মবিশ্বাসের নয়, কৌতূহলের সমস্যা বলেও ভাবা যেতে পারে। প্রকৃত কৌতূহল মানে এমন প্রশ্ন করা, যার উত্তর আমরা জানি না, আর উত্তর যা-ই আসুক তা মেনে নেওয়া। অভেদ্যতা পক্ষপাত এই ধাপটা এড়িয়ে যায় — ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকার আরামটা পাওয়া যায়, কিন্তু নিজের অবস্থানটা যাচাই করা হয় না। একজন প্রকৃত কৌতূহলী মানুষ নিজের চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে তেমনই প্রমাণ খোঁজেন, যেমনটা অন্য কোনো দাবি যাচাই করতে করতেন। কিন্তু এই প্রশ্নটা যেহেতু খুব ব্যক্তিগত, তাই অনেকে এখানে সেই কঠোর মানদণ্ড প্রয়োগ করেন না।

আসল ক্ষতি হয় পরে। একবার মনে করলেন আপনার কাজ আলাদা, তাহলে তার বিপরীতে প্রমাণ খোঁজা বন্ধ করে দেন। গবেষণা বলছে, এআই নিয়ে যাঁদের নিজের জ্ঞান বেশি, তাঁদের পক্ষপাত কম। তাই প্রযুক্তিটাকে দূর থেকে মতামত তৈরি করার বদলে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করাই ভালো। আপনার কাজ যে বিচারবুদ্ধি, সম্পর্ক বা অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে — এটা ভাবার কারণ আছে, কিন্তু ধারণাটা যাচাই করা জরুরি। নিজের দৈনন্দিন কাজগুলো আসলে কতটা এআই-এর সংস্পর্শে, সেটা না দেখে শুধু শিল্প বা কোম্পানির কথা ভাবলে ভুল হবে।

আত্মবিশ্বাস যখন অভিজ্ঞতা থেকে আসে, তখন সেটা স্বাভাবিক মনে হয় — আর সেটাই এই পক্ষপাতকে আরও জোরালো করে। যাঁরা এ পরিবর্তনের আগে থেকেই প্রস্তুত, আর যাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন, তাঁদের পার্থক্য বুদ্ধিমত্তা বা চেষ্টার নয়, বরং নিজের কাজ নিয়ে সেই আরামদায়ক ধারণাটাকে চ্যালেঞ্জ করার ইচ্ছে। অন্য কারও কাজ যে এআই বদলাবে, সেটা মেনে নিতে কারও অসুবিধা হয় না। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, আপনার নিজের কাজটা কি বদলাচ্ছে না — সেটা খোঁজার সাহস রাখছেন কি না।