আসামের রাজনীতিতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার এক মন্তব্য। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রাজ্যে কোনো প্রকাশ্য স্থানে যদি বিপ্লবীর প্রতীকী ছবি আঁকা হয়, তবে তা উলফা (আই) প্রধান পরেশ বড়ুয়ার হওয়া উচিত। এই বক্তব্য আসামসহ গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গুয়াহাটির একটি উড়ালসড়কের নিচে আঁকা জনপ্রিয় গায়ক জুবিন গার্গের দেয়ালচিত্র ঘিরে। চিত্রশিল্পী মার্শাল বড়ুয়া আঁকা ওই ছবিটি বিপ্লবী চে গুয়েভারার আদলে তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ। সম্প্রতি ছবিটি মুছে ফেলা হলে বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করে। সেই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যাঁরা ছবিটি সরিয়েছেন তাঁরা খাঁটি অহমিয়া ও জুবিনের ভক্ত, কিন্তু ‘চে স্টাইলে’ আঁকার কারণে জুবিনকে চিনতে পারেননি। তবে বিপ্লবী কারও ছবি আঁকার প্রয়োজন হলে স্থানীয় অহমিয়া বিপ্লবী যেমন পরেশ বড়ুয়া কিংবা নিহত সমাজকর্মী পরাগ দাসের ছবি আঁকা বেশি যুক্তিযুক্ত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত উলফা মূলত আসামকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। আটের দশকে এই আন্দোলনে আসাম উত্তাল হয়ে ওঠে, বহু মানুষ প্রাণ হারান। পরবর্তী সময়ে উলফার একটি অংশ আলোচনাপন্থী হয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে, কিন্তু উলফা-আই নামে পরিচিত গোষ্ঠীটি বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থান থেকে এখনো সক্রিয়। পরেশ বড়ুয়া দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় কোনো দেশে অবস্থান করে সংগঠন পরিচালনা করছেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁকে মূল স্রোতের রাজনৈতিক নেতারা অপরাধী ও সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছেন।
এ অবস্থায় হিমন্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্যকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, আসামি জাতীয়তাবাদকে আলাদাভাবে ভারতের মধ্যে তুলে ধরার কৌশল হিসেবে তিনি এই মন্তব্য করতে পারেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জানান, হিমন্ত হয়তো আসামি জাতীয়তাবাদের নায়কদের জনসমক্ষে আনার চেষ্টা করছেন। আগামী দিনে তামিল জাতীয়তাবাদের মতো আসামের জাতীয়তাবাদকেও স্বতন্ত্র পরিচয় দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে। তবে পরেশ বড়ুয়া একইসঙ্গে আসামি জাতীয়তাবাদের প্রতীক এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা একটি স্পর্শকাতর বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, চিত্রশিল্পী মার্শাল বড়ুয়া সিপিআইএমের ছাত্রসংগঠন এসএফআইয়ের সদস্য, যে কারণে তাঁর আঁকা জুবিনের ছবিটি চে গুয়েভারার মতো দেখতে। মার্শাল বড়ুয়া অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তাঁর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। বিশ্বশর্মা আরও বলেন, ভবিষ্যতে শিল্পীদের জন্য জুবিন গার্গের কেবল একটি অনুমোদিত প্রতিকৃতি ব্যবহারের নিয়ম চালু করা প্রয়োজন, যা জুবিনের স্ত্রী গরিমা শইকিয়া গার্গ নির্ধারণ করবেন।
জুন মাসে গুয়াহাটির গণেশগুড়ির উড়ালপুলে জুবিনের মূল ছবিটি জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর উপলক্ষে সৌন্দর্যবর্ধন অভিযানের অংশ হিসেবে মুছে ফেলা হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই সফর হয়নি। এই ঘটনায় আসামে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয় এবং পরবর্তী সময়ে মার্শাল বড়ুয়া সেখানে জুবিনের আরেকটি নতুন ছবি আঁকেন।
উল্লেখ্য, পরেশ বড়ুয়া প্রায় ৭০ বছর বয়সী এবং পাশের একটি শক্তিশালী দেশ থেকে ভারতের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের একজন স্বাধীনতাকামী ও বিদ্রোহী নেতাকে জনসমক্ষে আনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না দিলেও হিমন্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্য আগামী দিনের আসামের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।



