জার্মানির কেন্দ্র-ডান দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) সংসদীয় গ্রুপ প্রধান জেন্স স্পান তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি জানান, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সুখ ও রাজনৈতিক দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না বলেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে সপ্তাহের শুরুতে জানা যায়, স্পান ও তাঁর স্বামী ড্যানিয়েল ফুঙ্কে যুক্তরাষ্ট্রে এক ভাড়াটে মায়ের মাধ্যমে সন্তান লাভ করেছেন। জার্মানিতে সারোগেসি (ভাড়াটে মাতৃত্ব) নিষিদ্ধ হওয়ায় এই ঘটনা নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
স্পানের দল সিডিইউ দীর্ঘদিন ধরেই জার্মানির অভ্যন্তরে সারোগেসি নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও দলটি একটি প্রস্তাব পাস করে যেখানে বাণিজ্যিক বা অন্য কোনো মডেলের মাধ্যমেই হোক না কেন, সারোগেসিকে জার্মানিতে একটি ব্যবসায়িক রূপ দেওয়ার বিরোধিতা করা হয়। স্পান নিজেও অতীতে এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সাফ কথা বলেছেন। ২০২০ সালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি উদারপন্থী এফডিপি-র সারোগেসি আইন শিথিল করার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারও আগে, ২০১৫ সালে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, সমকামী ও খ্রিস্টান হিসেবে তাঁর পক্ষে 'ভাড়াটে গর্ভ' ধারণাটি মেনে নেওয়া ব্যক্তিগতভাবে খুব কঠিন।
এ অবস্থায় নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে স্পান বিবৃতিতে আরও বলেন, সংসদীয় গ্রুপের নেতা হিসেবে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগতভাবে সারোগেসির মাধ্যমে পিতা হওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, তা তিনি আগে বুঝতে পারেননি। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও জনমাধ্যমে ক্রমবর্ধমান নিষ্ঠুরতা এবং কঠোর সমালোচনা তাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে রাজনৈতিক আলোচনায় সব সময় মানবিক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি সবাইকে সদ্বিবেচনার পরামর্শ দেন।
স্পানের পদত্যাগের প্রতিক্রিয়ায় চ্যান্সেলর ও সিডিইউ নেতা ফ্রিডরিখ মের্জ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, রাজনীতিতে বিশ্বাসযোগ্যতা সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং জেন্স স্পানের সিদ্ধান্ত 'সঠিক' ও 'অনিবার্য' ছিল। তিনি দ্রুত স্পানের উত্তরসূরি নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানান। সিডিইউ-এর মিত্র দল ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়নের (সিএসইউ) সংসদীয় গ্রুপ প্রধান আলেকজান্ডার হফম্যান অস্থায়ীভাবে স্পানের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। হফম্যান স্পানের সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ সম্মানের দাবিদার বলে অভিহিত করেন।
এর আগে জার্মানির উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য মেকলেনবুর্গ-ভোর্পোমার্নের সিডিইউ নেতা ড্যানিয়েল পিটার্স একটি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পানের পদত্যাগ দাবি করেন। তিনি বলেন, ব্যক্তি হিসেবে এক রকম আচরণ করা এবং দলীয়ভাবে ভিন্ন অবস্থানে থাকা সম্পূর্ণ ভুল। স্পান জার্মান আইন উপেক্ষা করে নিজের ব্যক্তিগত সুখকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উল্লেখ্য, জার্মানির ১৯৯০ সালের ভ্রূণ সুরক্ষা আইন অনুযায়ী সারোগেসি একটি অপরাধ, যার শাস্তি তিন বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা। তবে বিদেশে সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান লাভ করলে তা শাস্তিযোগ্য নয়। জার্মানি ছাড়াও ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালিসহ একাধিক ইইউ দেশে সারোগেসি নিষিদ্ধ। সম্প্রতি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছে যে বিদেশে সারোগেসির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুদের আইনত তাঁদের পিতামাতার সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। অন্যদিকে ইতালি ২০২৪ সালে নিজ নাগরিকদের জন্য বিদেশে সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান নেওয়াকেও নিষিদ্ধ করে। এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জার্মান রাজনীতিতে স্পানের পদত্যাগ সারোগেসি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।


