উপসাগরীয় অঞ্চলে বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়লেও বাহরাইন আকার নয়, বরং নিজের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছে। দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন বোর্ডের (ইডিবি) প্রধান নির্বাহী নূর বিনতে আলী আলখুলাইফের মতে, ছোট রাষ্ট্র হওয়ার কারণে তারা বড় খেলোয়াড়দের সাথে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে নিজেদের সামর্থ্যের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ফরচুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তাদের লক্ষ্য বড় চুক্তি সই নয়, বরং দ্রুততা, উন্নত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, দক্ষ জনশক্তি এবং বিশেষায়িত খাতগুলোতে মনোনিবেশ করা।

বাহরাইন ইডিবি পাঁচটি মূল খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে: আর্থিক সেবা, উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, পর্যটন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। এসব খাতের মধ্যে আবার সম্ভাবনাময় উপখাত চিহ্নিত করে সেগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে বাহরাইনের আর্থিক সেবা খাত মোট জিডিপিতে তেল খাতকে ছাড়িয়ে যায় এবং বছর শেষে এর অবদান দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। বর্তমানে সম্পদ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ফ্যামিলি অফিস আকর্ষণের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে ইডিবি। গত মে মাসে লস অ্যাঞ্জেলেসে মিলকেন ইনস্টিটিউট সম্মেলনে অংশ নিয়ে উচ্চনিট সম্পদশালী ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে সংস্থাটি।

এক শতাব্দীরও বেশি আগে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যাংকিং খাতের সূচনা করেছিল বাহরাইন। দেশটি এখনো এই অঞ্চলের অন্যতম প্রগতিশীল আর্থিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত। ২০১৭ সালের জুন মাসে ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রথম নিয়ন্ত্রক স্যান্ডবক্স চালু করে বাহরাইন। ওপেন ব্যাংকিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ন্ত্রণ এবং স্টেবলকয়েন আইন প্রণয়নেও তারা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। আলখুলাইফ উল্লেখ করেন, বিশ্বের অনেক বড় ব্যাংক তাদের সদর দপ্তর দুবাই বা সৌদি আরবে রাখতে চায়, কিন্তু ডিজিটাল ব্যাংকিং বা নতুন সেবা চালুর জন্য বাহরাইন একটি আদর্শ পরিবেশ সরবরাহ করতে পারে কারণ জিসিসির অন্যান্য দেশে নেই এমন নিয়মকানুন এখানে বিদ্যমান।

প্রযুক্তি খাতে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) বাহরাইনের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশটিতে এডব্লিউএসের দুটি ক্লাউড ইনোভেশন সেন্টার (সিআইসি) রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করছে প্রতিষ্ঠানটি। বাহরাইন ২০১৮ সালে 'ডেটা এমবাসি' আইন প্রণয়নকারী প্রথম দেশ, যা বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে তাদের তথ্য নিজ দেশের এখতিয়ারে সংরক্ষণের সুযোগ দেয়। এখন পর্যন্ত এ আইন কেবল বাহরাইনেই রয়েছে। গত বছর বাহরাইনের প্রযুক্তি গ্রুপ বেয়ন ওরাকলের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে গ্রাহকরা দেশের বাইরে তথ্য না পাঠিয়েই ওরাকলের ক্লাউড সেবা ব্যবহার করতে পারবেন। তবে সম্প্রতি ইরানের ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি এডব্লিউএস ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাহরাইনের একটি স্থাপনাও আংশিক ক্ষতির শিকার হয়। ইডিবি জানায়, যুদ্ধ সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রয়েছে, তবে পর্যটন ও উৎপাদন খাতে কিছুটা প্রভাব পড়েছে।

উৎপাদন খাত বাহরাইনের ইডিবির কৌশলের একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য ইউএস ট্রেড জোন (ইউএসটিজেড) নামে একটি বিশেষ শিল্প অঞ্চল তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ছাড় দেওয়া হবে। বর্তমানে বাহরাইন ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পার্ক ও বাহরাইন ইনভেস্টমেন্ট ওয়ার্ফে মন্ডেলিজ, বিএএসএফ, আরলা ও রেকিটের মতো কোম্পানি অবস্থান করছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য-জিসিসি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করছে ইডিবি। অ্যালুমিনিয়াম, জ্বালানি, জীবনবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা দেখছে সংস্থাটি।

বাহরাইন ইডিবি ২০৩০ দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি ২০৫০ সালের পরিকল্পনা নিয়েও কাজ শুরু করেছে। আলখুলাইফ জানান, শুধু বৈচিত্র্যকরণ নয়, অর্থনীতির মূল্য বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। তিনি সিঙ্গাপুরের উদাহরণ টেনে বলেন, আয়তনে সমান হলেও সিঙ্গাপুরের জিডিপি বাহরাইনের চেয়ে দশগুণ বেশি। তাই উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং মূল্য সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ইডিবি। আগামী পাঁচ বছরে তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জিডিপি বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জাতীয় ব্র্যান্ড তৈরি করতে চায়। আলখুলাইফের মতে, বিশ্বের অনেক বিনিয়োগকারী উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদকে একটি সমজাতীয় বাজার হিসেবে দেখেন। বাহরাইন চায় বিনিয়োগকারীরা বুঝুক এই দেশটি কী বিশেষ সুযোগ দিতে পারে। এ লক্ষ্যেই নিজস্ব কৌশল ও অবস্থান স্পষ্ট করার কাজ করছে ইডিবি।