জীবনের সব স্বপ্ন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল মাত্র এক ঝলক মাথা ঘোরার কারণে। ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি, ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে পা ফসকিয়ে লাইনে পড়ে ট্রেনের ইঞ্জিনের নিচে কাটা পড়ে রুবিনা খাতুনের দুই পা। জগ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শেষ বর্ষের এই মেধাবী ছাত্রী তখন অসুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরছিলেন। আট বছর পেরিয়ে গেলেও কর্মজীবনের একটি সুযোগই হয়ে ওঠেনি তার জীবনের বেঁচে থাকার মূল উপজীব্য।
রুবিনা খাতুনের বর্তমান ঠিকানা পঞ্চলগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দণ্ডপাল ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকা। সেখানে তার অগোছালো ঘরে একটি হুইলচেয়ারই যেন তার চলাফেরার একমাত্র সম্বল। বিছানায় বসে বই পড়ার দৃশ্যই এখন তার নিত্যদিনের বাস্তবতা।
দুর্ঘটনার পর রেলওয়ে পুলিশ রুবিনাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখান থেকে শুরু হয় এক দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়া। সরকারি-বেসরকারি নানা মহল থেকে আর্থিক সহায়তা ও চাকরির আশ্বাসও মিলেছিল। কিন্তু সেই সব প্রতিশ্রুতি কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ‘হাসপাতালের বেডে শুয়েই অনার্সের শেষ পরীক্ষা দিয়েছিলাম। পাস করেছি, কিন্তু মাস্টার্স আর করা হয়নি। জীবনটাই অন্য দিকে চলে গেল,’ বলেন রুবিনা।
পরিবারে অভাব ছিল চিরসঙ্গী। বাবা রবিউল ইসলাম দিনমজুর ছিলেন। এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া রুবিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার কিছুদিন পরই বাবা মারা যান। তখন সংসার সমলানোর ভার নেন মা রহিমা খাতুন। শিক্ষাবৃত্তি, টিউশনি আর মায়ের হাঁস-মুরগি পালনের আয়েই চলতো পড়াশোনা। দুর্ঘটনাটি সেই লড়াইকেও থামিয়ে দেয়।
চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে পুরোপুরি অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পরেন তিনি। বিভিন্ন সাহায্যের টাকায় ছোট ভাই রুবেল হক ও মায়ের প্রচেষ্টায় একটি ক্ষুদ্র গরুর খামার গড়ে উঠেছিল। পরিবারটি আবারও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন টেকেনি বেশিদিন।
ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্রে দিনাজপুরের জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে ২০২২ সালের ৩ মার্চ রুবিনার বিয়ে হয়। শারীরিক অক্ষমতার কথা জেনেও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জাহাঙ্গীর। রুবিনার দাবি, বিয়ের পর তার স্বামী খামারের গরু বিক্রি করে প্রায় ১১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন এবং এরপর থেকেই তার সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করেন। মায়ের ক্যানসারে আক্রান্ত থাকাকালীন ২০২৪ সালের ১ জুন নির্যাতনের শিকার হয়ে স্থানীয় প্রতিনিধিদের সহযোগিতায় পিত্রালয়ে ফিরে আসেন রুবিনা। পরবর্তীতে স্বামী তাকে তালাক দেন।
ভবিষ্যতের প্রতি আরও বড় আঘাত নেমে আসে কয়েক মাসের মধ্যেই। ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ক্যানসারে আক্রান্ত মা মারা যান। এরপর থেকে পাঁচমা বাবার রেখে যাওয়া ৫৩ শতক আবাদি জমির ফসল দ্বারাই কোনোমতে চলছে সংসার। রুবেনার ছোট ভাই রুবেল হক, যিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরি খুঁজছেন, তিনিই এখন সংসারের একমাত্র অভিভাবক। তিনি বলেন, ‘মা মারা যাওয়ার পর দুই বোনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার ওপর। বড় বোন জুলেখা মানসিক প্রতিবন্ধী, আর মেজ বোনের দু পা নেই। নিজের ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা আর দুই বোনকে দেখাশোনা একসাথে সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমাদের দুই ভাইবোনের কারও একটিমাত্র কর্মসংস্থান হলে অন্তত খেয়েপরে বেঁচে থাকতে পারব।’
রুবিনা এখনো বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু চাকরির বয়সসীমা প্রায় শেষের দিকে। তিনি জানান, ‘একটা চাকরির আশায় এখনও পরীক্ষা দিচ্ছি, কিন্তু সময় ফুরিয়ে আসছে। আমাদের খোঁজ নেওয়ার মতো এখন আর কেউ নেই।’ এককালে মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে স্বপ্ন জয় করতে চাওয়া রুবিনার কাছে আজ একটি চাকরিই হয়ে উঠেছে নতুন করে বেঁচে ওঠার শেষ অবলম্বন।




