বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত জ্বালানি বাজারের উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংকট এবং সরবরাহ ঘাটতির কারণে তেলের অবাধ পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় রুদ্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পারস্য উপসাগরে একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা স্থগিত করে কূটনৈতিক আলোচনায় বসেছে। একই সঙ্গে ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার জন্য পৃথক বৈঠক করছে। তবে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ মান্য করে ওয়াশিংটন ও আঞ্চলিক প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো কোনো চুক্তি মেনে নেবে এমনটা মনে হচ্ছে না।

এদিকে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা বাব-এল-মান্দেব প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে হাণকি দিচ্ছে। সৌদি আরব হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে তেল রপ্তানির জন্য এই পথ ব্যবহার করে আসছিল। জাহাজগুলো সুয়েজ খাল ঘুরে বাব-এল-মান্দেব এড়াতে পারলেও সেটি বড় আকারের তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে ধারণ করতে পারে না। পাশাপাশি ইরান সুয়েজ খালেও হামলা চালানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কমোডিটি কৌশলের প্রধান হেলিমা ক্রফট সিএনবিসিকে বলেন, “নতুন এই লোহিত সাগর পরিস্থিতির জেরে আমরা এমন এক অবস্থার কথা ভাবতে শুরু করেছি যেখানে কোনো নিষ্ক্রমণের পথ খোলা থাকবে না।”

একই সময়ে ইউক্রেন সম্প্রতি রাশিয়ার তেল পরিকাঠামো এবং কৃষ্ণ সাগরে তার তেল ও পরিশোধিত পণ্যবহনকারী জাহাজের উপর আক্রমণ জারি রেখেছে। রাশিয়া বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় ডিজেল উৎপাদক দেশ। কিন্তু সেদেশের তেল শোধনাগারগুলোর ক্ষতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ এতটাই কমে গেছে যে মস্কো দেশীয় ভোক্তাদের জন্য মজুত নিশ্চিত করতে রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বাধ্য হয়েছে। ক্রফট আরও যোগ করে বলেন, “এর ফলে অশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানির বাজারও উল্লেখযোগ্য ভাবে আঁটসাঁট হয়ে পড়ছে। ওয়াশিন্টনের বর্তমান প্রশাসন এখন সবকিছু একযোগে মোকাবিলার এক পরিস্থিতির সম্মুখীন।”

সবশেষ এই জটিলতার মধ্যে কাস্পিয়ান সাগরে ইউক্রেন একটি ইরানি জাহাজে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেই জাহাজটি ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে সামরিক সরবরাহ বহন করছিল বলে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। রাইস্টাড এনার্জির ডাউনস্ট্রিম গবেষণার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সুসান বেল হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে অপরিশোধিত তেলের তুলনায় পরিশোধিত জ্বালানির সংকট পরিস্থিতি আরও অনেক খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। বুধবার ব্লুমবার্গ টিভিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যাখ্যা করেন, ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অপরিশোধিত তেলের মজুত ছিল ৪.৪ বিলিয়ন ব্যারেল। কিন্তু পেট্রোল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত পণ্যের মজুত ছিল মাত্র প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ব্যারেল।

পরবর্তীতে উভয়ের মজুতই ২০০ মিলিয়ন ব্যারেল করে কমে যাওয়ায় পরিশোধিত জ্বালানির ক্ষেত্রে নমনীয়তার সুযোগ অনেক সীমিত হয়ে এসেছে। এর ফলশ্রুতিতে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি তেলের মূল্যের পার্থক্যবাহী ‘ক্র্যাক স্প্রেড’ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বেল-এর মতে, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের ক্র্যাক স্প্রেড যেখানে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮ ডলার ছিল, এখন তা ৪০ থেকে ৫০ ডলারে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, “পণ্যের মজুত অনেক কম থাকায় শুরুই হয়েছিল, ফলে পণ্যের মজুত নিয়ে সংকট আরও গভীর হচ্ছে।”

ইতিমধ্যে ইরান যুদ্ধের এই দ্বিতীয় ধাপে তেলের দাম আবারও প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছালেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের তেমন কোনো বিকল্প নেই বললেই চলে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ তাদের জরুরি মজুত ব্যবহার করে ফেলেছে; বিভক্ত কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া জ্বালানি কর হ্রাসের সম্ভাবনা নেই; আমেরিকার তেল উৎপাদনকারী ও পরিশোধন কারখানাগুলো ইতোমধ্যে প্রায় রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি উৎপাদন করছে; এবং প্রশাসন জোনস অ্যাক্ট স্থগিত করায় যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূল থেকে পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে জ্বালানি সরানোর জন্য অতিরিক্ত জাহাজের ব্যবস্থা হয়েছে। পিকারিং এনার্জি পার্টনারসের প্রতিষ্ঠাতা ড্যান পিকারিং ফরচুন ম্যাগাজিনকে বলেছেন, যদি বাব-এল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালী দুইটিই প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আগাম আগস্টে তেলের দাম এপ্রিলের শেষের দিকের সর্বোচ্চ ১২৪ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমরা যদি প্রণালীটির কার্যকর বন্ধ এবং হুথি আক্রমণের ফলে লোহ সাগর বন্ধের পরিস্থিতিতে পড়ি, তাহলে আগস্টেই পরিস্থিতি খুব দ্রুত খারাপ হবে বলে আমার মনে হচ্ছে।”