উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিকতা, সহনশীলতা এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা নিশ্চিত না করা হলে সমাজ থেকে বৈষম্য, অস্থিরতা ও দুর্নীতি দূর করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। রোববার (২ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘শান্তির জন্য দর্শন’ শীর্ষক দুই দিনের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনী আয়োজনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। ইউজিসির জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক শাহ কাওসার মুস্তাফা আবুলওলায়ী। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান, ভারতের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক সন্তোষ কুমার পাল, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এবং সংগঠনটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া।
ইউজিসি চেয়ারম্যান তার বক্তব্যে যুক্তি দেন, দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা শেষে রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষা, শিল্প ও অর্থনীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদান করে। সুতরাং, বিশ্ববিদ্যালয়ে জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার অনুশীলন না হলে, ভবিষ্যৎ নীতি-নির্ধারকেরা সমাজে ন্যায্যতা আনতে ব্যর্থ হতে পারেন। এর পরিণতিতে সামাজিক অস্থিরতা, বৈষম্য ও দুর্নীতির মাত্রা আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের ছায়ায় সমাজের বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির মানুষ যে নিপীড়ন, অন্যায় ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, সেই ইতিহাস অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিহিংসা নয়, বরং ক্ষমাশীলতা, আলাপ-আলোচনা ও ন্যায়-ভিত্তিক পুনর্মিলনের একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা অপরিহার্য। একটি মানবিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ নির্মাণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবার হলো সহনশীলতা, দায়বোধ ও নৈতিক মূল্যবোধ শেখার প্রাথমিক পঠশালা।
শিক্ষার্থীদের ভেতরে নৈতিক গুণাবলি, নেতৃত্বের ক্ষমতা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রসার ঘটাতে ইউজিসি ইতোমধ্যে পাঠক্রম বহির্ভূত কার্যক্রম হিসেবে সফট স্কিল, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সংক্রান্ত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এই উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরির কাজও শুরু হয়ে গেছে।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ আরও জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় উন্নয়নকে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চোখে দেখা যাবে না। উন্নয়নের মূল ভিত্তি হতে হবে নৈতিকতা, মানবিকতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। মূল্যবোধ বিবর্জিত উন্নয়ন সমাজে অস্থিরতা ও বৈষম্য ডেকে আনলেও তা স্থায়ী শান্তির নিশ্চায়তা দিতে পারে না। তাই প্রযুক্তির প্রসার ও অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের বিকাশেও সমান তালে জোর দিতে হবে।
তিনি স্পষ্ট করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল চাকরি পাবার প্রস্তুতি নয়; এটি একজন শিক্ষার্থীকে দায়িত্ববান নাগরিক, নৈতিক নেতৃত্বের অধিকারী ব্যক্তি এবং এক বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, নৈতিক শিক্ষা, আন্তঃবিষয়ক গবেষণা এবং যুক্তিভিত্তিক কথোপকথনের সংস্কৃতি আরও মজবুত করতে তিনি দর্শনশাস্ত্রের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষাবিদদের প্রতি আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের প্রথিতযশা শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও দার্শনিকগণ অংশ নেন। দুই দিন জুড়ে চলা এই আয়োজনে শান্তি, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, দর্শন চর্চা এবং বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দর্শনের অবদান নিয়ে একাধিক গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপনা ও আলোচনা পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।



