মিষ্টি লিচু খেতে হলে যদি জ্যামিতির কঠিন উপপাদ্যের সমাধান করতে হয়, তাহলে কেমন লাগবে? সাজেদুল করিমের কিশোর গল্প 'জ্যামিতি কষে লিচু খাও' এমনই এক চমকপ্রদ ভাবনা উপস্থাপন করেছে, যেখানে পড়ালেখার প্রতি ভীতি দূর করে জ্যামিতিকে একটি আনন্দদায়ক খেলায় রূপ দেওয়া যায়। তবে জ্যামিতির এই কৌশল শুধুই লিচু খাওয়ার জন্য নয়; এটি গোয়েন্দা গল্পের রোমাঞ্চকর রহস্য উন্মোচন ও আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত নির্মাণেও সমানভাবে কাজে লাগে।
পৃথিবী বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমসও জ্যামিতির এই জাদুর কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। স্যার আরন কনান ডয়েলের 'দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য মাসগ্রেভ রিচুয়াল' গল্পে এমন একটি ঘটনার বর্ণনা আছে, যেখানে হোমসকে একটি কাটা গাছের ছায়ার দৈর্ঘ্য নির্ণয় করতে হয়েছিল। গাছটির অস্তিত্ব তখন মাটির বুকে আর অবশিষ্ট ছিল না। অথচ হোমস নিরাশ না হয়ে সঠিক সময়ে সূর্য আসার জন্য অপেক্ষা করেন এবং নিজের ৬ ফুট লম্বা একটি মাছ ধরার ছিপ মাটিতে পুঁতে দেন। এরপর ছিপের ছায়া মেপে জ্যামিতিক হিসাবের মাধ্যমে সেই রহস্যময় বিন্দু খুঁজে বের করেন।
তার হিসাবটি ছিল সহজ: গাছটি ছিপের চেয়ে ৬৪/৬ গুণ লম্বা হওয়ায়, এর ছায়াও ছিপের ছায়ার ৬৪/৬ গুণ হবে। এই জ্যামিতিক কৌশলকে 'সদৃশ ত্রিভুজ' বলা হয়, যেখানে সূর্যের আলোর আপতন কোণে কোনো বস্তুর উচ্চতা ও তার ছায়ার দৈর্ঘ্যের অনুপাত সর্বদা ধ্রুব থাকে। এই একই যুক্তি ব্যবহার করেই শতাব্দীর আগে গ্রিক গণিতবিদ থেলিস মিসরের পিরামিডের উচ্চতা মেপে সারা বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিলেন।
শুধু গোয়েনদাগিরিই নয়, প্রায় ১২০০ বছরের পুরনো গাণিতিক ধাঁধা সমাধানেও সদৃশ ত্রিভুজ অনন্য ভূমিকা রাখে। খ্রিস্টাব্দ ৮৫০ সালের বিখ্যাত ভারতীয় গণিতবিদ মহাবীর তাঁর গ্রন্থে 'গলি ও মইয়ের ধাঁধা' উল্লেখ করেন। দুটি দেয়ালে আড়াআড়ি রাখা দুটি মইয়ের ছেদবিন্দুর উচ্চতা (h) কি দুটো দেয়ালের দূরত্বের ওপর নির্ভর করে? প্রচলিত ধারণার বিপরীতে সদৃশ ত্রিভুজের নিয়ম প্রমাণ করে যে, গলি যত চওড়া বা সরুই হোক, ছেদবিন্দুর উচ্চতা সবসময় ১/h = ১/a + ১/b সূত্র দ্বারা নির্ধারিত হয়, যেখানে গলির চওড়ার কোনো চলর নেই।
এই শক্তিশালী ধারণা পিথাগোরাসের উপপাদ্যের সর্বাপেক্ষা চমৎকার প্রমাণ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছিল। বলা হয়, আলবার্ট আইনস্টাইন যখন মাত্র ১২-১৩ বছর বয়সের কিশোর, তখন তিনি নিজেই সদৃশ ত্রিভুজের ধারণায় পিথাগোরাসের উপপাদ্যটির একটি অভিনব প্রমাণ রচনা করেন। একটি সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের ওপর সমকোণ থেকে লম্ব টানলে মূল ত্রিভুজটি এমন দুটি ক্ষুদ্র ত্রিভুজে বিভক্ত হয়, যারা মূল ত্রিভুজের সাথে সম্পূর্ণ সদৃশ। এই সূত্র কাজে লাগিয়ে ত্রিভুজগুলোর বাহু ও তাদের অনুপাত থেকে সূক্ষ্মভাবে a² + b² = c² প্রমাণ করা সম্ভব। অন্যভাবে, সদৃশ ত্রিভুজের ক্ষেত্রফলের অনুপাতের নিয়ম প্রয়োগ করেও একই ফলাফলে পৌঁছানো যায়, যা প্রমাণের আরও বুদ্ধিদীপ্ত একটি পন্থা।
ক্ষেত্রফল ও সদৃশতার পারস্পরিক সম্পর্কও গভীর। একটি আয়তক্ষেত্র ABCD-র কর্ণ AC-এর ওপর যেকোনো বিন্দু E নেওয়া হলে, সেই বিন্দু দিয়ে বাহুর সমান্তরাল রেখা টানলে যে দুটি সমকোণী ত্রিভুজ তৈরি হয়, তারা সদৃশ। এই ঘটনা থেকে ত্রিভুজের বাহুগুলোর অনুপাতের সম্পর্ককে ক্ষেত্রফলহিসাবের মাধ্যমেও অত্যন্ত চমৎকার ভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়। জ্যামিতির এই সব বিস্ময়কর প্রয়োগ প্রমাণ করে যে এটি কেবল খাতার পাতায় আঁকা কিছু শুষ্ক দাগ নয়, বরং সঠিক বুদ্ধি খাটালে এটি রহস্যের জট খোলার এক ধারালো অস্ত্র।


