অ্যামাজন ফরচুনের বৈশ্বিক রাজস্বভিত্তিক বৃহত্তম কোম্পানির তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে, যা দীর্ঘদিন ধরে ওয়ালমার্টের দখলে ছিল। ১৯৯৫ সালে ওয়াশিংটনের বেলেভিউতে নিজের গ্যারেজে কাঠের দরজা দিয়ে তৈরি টেবিলে বসে অনলাইন বইয়ের দোকান শুরু করেছিলেন জেফ বেজোস। তিন দশক পর সেই ছোট উদ্যোগটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজস্ব আয়কারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বেজোস ফরচুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, এই সাফল্য তার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত নয়। তিনি বলেন, বড় হওয়া কখনোই লক্ষ্য ছিল না, বরং গ্রাহকদের সেবা দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য। গ্রাহক সেবায় মনোযোগ দিলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রবৃদ্ধি আনে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অ্যামাজনের যাত্রা শুরুতে ছিল কঠিন। ইন্টারনেটের ধারণা ব্যাখ্যা করতে হতো বিনিয়োগকারীদের। প্রায় ৬০ জন বিনিয়োগকারীর কাছে দশ লাখ ডলার তোলার চেষ্টা করেছিলেন বেজোস; মাত্র ২২ জন সম্মত হন, প্রত্যেকে প্রায় ৫০ হাজার ডলার দিয়ে। ১৯৯৭ সালে পাবলিক হয় কোম্পানিটি, আইপিও মূল্য ছিল ১৮ ডলার, মূল্যায়ন প্রায় ৪৪ কোটি ডলার। বর্তমানে অ্যামাজনের বাজারমূল্য ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রথম দিকে মুনাফা অর্জন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি; ২০০০ সালের শুরুর দিকেও ‘অ্যামাজন.বম্ব’ শিরোনামে বারনস-এর প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল এটি কখনো লাভজনক হবে কিনা। বেজোস স্বীকার করেন, সেই সময়ে কেউ এত বড় পরিবর্তনের ভবিষ্যদ্বাণী করলে তাকে পাগলাগারদে পাঠানো হতো।
২০০৬ সালে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) চালু হওয়ার পর সবকিছু বদলে যায়। আজ লক্ষ লক্ষ ব্যবসা ও সরকারি সংস্থা এডব্লিউএসের ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবহার করছে। ২০২৫ সালে এডব্লিউএসের পরিচালন মুনাফা ৪৫.৬ বিলিয়ন ডলার এবং রাজস্ব ২০% বেড়ে ১২৮.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এরপর প্রাইম সদস্যপদ, কিন্ডল, স্ট্রিমিং পরিষেবা, হোল ফুডস অধিগ্রহণসহ নানা উদ্যোগ অ্যামাজনের পরিধি বাড়িয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটি এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে; ২০২৫ সালে পুঁজি ব্যয় ছিল ১৩১ বিলিয়ন ডলার, ২০২৬ সালে তা ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে বলে ধারণা। মেটা ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে নিজস্ব চিপস ব্যবসা গড়ে তুলছে। বেজোস বলছেন, চিপস ও সিলিকন ব্যবসাই হতে পারে পরবর্তী বড় স্তম্ভ।
তবে এত বড় সাফল্যের মধ্যেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। খুচরা খাতে ওয়ালমার্টের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নেতৃস্থানীয় অবস্থান ধরে রাখা—এসবই বড় চ্যালেঞ্জ। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যামি ওয়েব মনে করেন, বেজোস সিইও পদ ছেড়ে দেওয়ায় এআই দৌড়ে অ্যামাজন হয়তো পিছিয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে ফেডারেল ট্রেড কমিশন ও ১৭টি অঙ্গরাজ্য অ্যামাজনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা আটকানোর অভিযোগ এনেছে। মামলার শুনানি শুরু হবে ২০২৭ সালে। সংস্থাটি তার কর্মীদের সাথেও টানাপোড়েনের মুখোমুখি; গুদাম কর্মীরা ইউনিয়ন গঠনের দাবি জানিয়েছেন, এবং কর্পোরেট কর্মীদের মধ্যে বড় ছাঁটাই করা হয়েছে।
বেজোস নিজে অ্যামাজনের বাইরেও ব্লু অরিজিন ও গোপন এআই স্টার্টআপ প্রমিথিউসে বিনিয়োগ করছেন। তার মতে, উদ্ভাবনের মাধ্যমে সভ্যতার সম্পদ বাড়ানো সম্ভব। অ্যামাজনের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী, তবে সতর্কও—গ্রাহক কেন্দ্রিকতা ও উদ্ভাবন বন্ধ হয়ে গেলেই কোম্পানির পতন শুরু হবে বলে মনে করেন।




