জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী নীল ডিগ্র্যাস টাইসনের মতে, একজন বিজ্ঞানী আসলে এমন এক শিশু, যে কখনো বড় হয়নি। তার এই মন্তব্য এসেছে সাংবাদিক ল্যারি কিং-এর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে, যা ২০১৩ সালের নভেম্বরে ‘ল্যারি কিং নাউ’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়। সম্প্রতি বিজ্ঞানচিন্তা পত্রিকা সাক্ষাৎকারটির অনুবাদ প্রকাশ করেছে। হার্লেমে জন্ম নেওয়া টাইসন ছোটবেলায় হেইডেন প্ল্যানেটারিয়ামে প্রথম যাওয়ার ঘটনাকে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, প্ল্যানেটারিয়ামের চেয়ারে বসে কৃত্রিম আকাশে তারাদের উত্থান দেখে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান এবং মনে করেন সেদিন মহাবিশ্বই তাকে বেছে নিয়েছিল। মাত্র ৯ বছর বয়সে এই উপলব্ধি তার মধ্যে গণিতভীতি তৈরি হতে দেয়নি, কারণ তিনি মহাবিশ্বের ভাষা হিসেবে গণিতকে শিখতে চেয়েছিলেন।
সাক্ষাৎকারে নাসার তৎকালীন অচলাবস্থা নিয়েও কথা বলেন টাইসন। তিনি মনে করেন, সরকারের অচলাবস্থার জন্য দায়ী জনগণই, কারণ তারাই ভুল প্রতিনিধি নির্বাচিত করে। মহাকাশ গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি মানুষের সহজাত কৌতূহলের বহিঃপ্রকাশ। পৃথিবীতে দারিদ্র্য ও ক্ষুধার মতো সমস্যা থাকলেও মহাকাশ গবেষণা শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে (STEM) উদ্বুদ্ধ করে, যা ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিকে কাজে লাগানো বা গ্রহাণুর পথ পরিবর্তনের মতো জটিল সমস্যার সমাধান দিতে পারে।
নীল টাইসন স্বীকার করেন, ছোটবেলায় নভোচারী হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সেই সময় নাসা মূলত সামরিক পাইলটদের বেছে নিত, যার সাথে তার আকাঙ্ক্ষার মিল ছিল না। তিনি মঙ্গল গ্রহ বা কোনো গ্রহাণুতে যেতে আগ্রহী, নিছক পৃথিবীর কক্ষপথে ঘোরার জন্য নয়। মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব প্রসঙ্গে তিনি পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করে বলেন, মহাবিশ্বে আমরা একা—এমন দাবি করা অহংকার। বুদ্ধিমান প্রাণীর সংজ্ঞা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বিজ্ঞান ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে টাইসন বলেন, বিজ্ঞানীরা সাধারণ মানুষের তুলনায় কম ধার্মিক হলেও সংখ্যাটি শূন্য নয়। তাদের ধর্মীয় চেতনা মূলত আধ্যাত্মিকতা ও সৃষ্টিকর্তার উপলব্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ, এবং তারা বাইবেলকে বিজ্ঞানের পাঠ্যবই হিসেবে গণ্য করেন না। নিজের পরিবারের কথা বলতে গিয়ে টাইসন উল্লেখ করেন, তার বাবা সিরিল ডিগ্র্যাস টাইসন নাগরিক অধিকার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এবং মা পরে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। তার মা-বাবা তাকে কোনো নির্দিষ্ট পেশায় বাধ্য করেননি, বরং তার নিজের আগ্রহকে লালন করেছিলেন।
পৃথিবী হঠাৎ ঘোরা থামালে কী হবে—এই প্রশ্নের জবাবে টাইসন ব্যাখ্যা করেন, নিউইয়র্কের অক্ষাংশে মানুষ ঘণ্টায় ৮০০ মাইল বেগে পূর্ব দিকে ছুটছে। হঠাৎ থামলে সবকিছু সেই বেগে ছিটকে যাবে, যা হবে ভয়াবহ বিপর্যয়। তবে ধীরে ধীরে থামলে দিন অনেক লম্বা হবে মাত্র। পদার্থবিজ্ঞানের জগতে তাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কণাপদার্থবিজ্ঞানের নেতৃত্ব থেকে সরে আসা, যেখানে এখন ইউরোপের সার্নই এগিয়ে রয়েছে। আন্তনক্ষত্র ভ্রমণের বাধা হিসেবে তিনি সময়ের বিশালতাকে উল্লেখ করেন। বর্তমান প্রযুক্তিতে নিকটতম নক্ষত্রে পৌঁছাতে ৪০ হাজার বছর লাগবে, যা অতিক্রম করতে নতুন প্রযুক্তি বা প্রজন্মের ধারণা প্রয়োজন।
সাক্ষাৎকারের শেষে টাইসন আবারও শৈশবের কৌতূহল ধরে রাখার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, সমাজ শিশুদের ‘চুপ করো’ বলে তাদের সৃজনশীলতা নষ্ট করে দেয়। যারা সেই দমনের বাইরে নিজের আগ্রহ টিকিয়ে রাখতে পারে, তারাই প্রকৃত বিজ্ঞানী হয়ে ওঠে।




