যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প গত ৯ এপ্রিল জেফরি এপস্টিন-সংক্রান্ত বিতর্ক ও প্রয়াত এই যৌন অপরাধীর সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের সম্পর্ক নিয়ে হোয়াইট হাউসের প্রধান ফটকে একটি আকস্মিক বক্তব্য রেখেছিলেন। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই বক্তব্য ব্যাপক বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। কারণ, ততদিনে ট্রাম্প প্রশাসন মাসের পর মাস ধরে এপস্টিন-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আসছিল। অথচ মেলানিয়া সেদিন প্রকাশ্যে নির্যাতনের শিকার নারীদের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন এবং পরোক্ষভাবে কংগ্রেসে গড়ে ওঠা দ্বিদলীয় উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানান, যার লক্ষ্য ছিল গোপন নথিগুলো প্রকাশ করা।
এখন ফার্স্ট লেডির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক বেকম্যান পলিটিকোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেছেন, রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্বচ্ছতা সত্ত্বেও কেন মেলানিয়া প্রকাশ্যে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বেকম্যানের ভাষ্যে, জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে মেলানিয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং বর্তমানেও নেই— এই সত্যটি কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে লিপিবদ্ধ করানোর এটিই ছিল একটি সুবর্ণ সুযোগ। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, এই কারণেই মেলানিয়া নিজেকে ভুক্তভোগীদের একজন সমর্থক ও তাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। একইসঙ্গে তিনি আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, যাতে আক্রান্ত নারীরা চাইলে কংগ্রেসে হাজির হয়ে শপথ গ্রহণপূর্বক নিজেদের জবানবন্দি রেকর্ডভুক্ত করতে পারেন।
এপ্রিলের সেই ভাষণে মেলানিয়া স্পষ্ট করেন, তিনি কখনোই এপস্টিনের বন্ধু ছিলেন না, তার মাধ্যমে কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হননি, এবং এপস্টিনের কোনো অপরাধ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না। এমনকি এপস্টিন তাকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বলেও যে দাবি প্রচলিত আছে, তাও তিনি অস্বীকার করেন। পাশাপাশি তিনি কংগ্রেসের প্রতি গণশুনানি আয়োজনের ডাক দিয়ে বলেন, প্রত্যেক নারীরই নিজের গল্প প্রকাশ্যে বলার অধিকার থাকা উচিত।
তবে ফার্স্ট লেডির এই অবস্থান প্রশংসা কুড়ালেও সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিল না। একই মাসে এপস্টিনের জীবিত ভুক্তভোগীদের একটি সংগঠন এক বিবৃতিতে অভিযোগ তোলে যে, মেলানিয়া বাস্তবে ভুক্তভোগীদের কাঁধেই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রমাণের দায়ভার চাপিয়ে দিচ্ছেন। অথচ ২০২৫ সালে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের আপত্তি সত্ত্বেও কংগ্রেস বিচার বিভাগকে এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি উন্মোচনের প্রক্রিয়া শুরু করতে বাধ্য করেছিল। সংগঠনটির মতে, ফার্স্ট লেডি এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বোঝা চাপাচ্ছেন যেখানে বিচার বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ট্রাম্প প্রশাসন এখনো ‘এপস্টিন ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করেনি।
অন্যদিকে, মেলানিয়ার পদক্ষেপের প্রশংসাও করেছেন অনেকে। নিজেও যৌন নিপীড়নের শিকার— এমন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ন্যান্সি মেস সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছিলেন, একজন টিকে থাকা ভুক্তভোগী হিসেবে তার কাছে এটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। তিনি মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি যখন এপস্টিনের ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করেন, তখন তা সত্যিকার অর্থেই একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই নারীদের কথা শোনানোর সুযোগ প্রাপ্য, এবং সেদিন তারা সেই সুযোগ পেয়েছেন।
উল্লেখ্য, বিচার বিভাগ এখনো এপস্টিন-সংক্রান্ত কিছু নথি গোপন রাখার ব্যাপারে অনড় অবস্থানে আছে। তাদের যুক্তি, ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার খাতিরেই এসব তথ্য অপ্রকাশিত রাখা জরুরি। ফার্স্ট লেডির বক্তৃতার পর নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেছিলেন, এতে তার কোনো আপত্তি নেই। তিনি জানতেন না মেলানিয়া কী বলবেন, কেবল এটুকুই জানতেন যে তিনি একটি বিবৃতি দিতে চলেছেন। ইতোমধ্যে একজন ফেডারেল বিচারক স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, এপস্টিন তদন্ত ফাইলের যেসব অংশ মুছে বা ঢেকে প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত রূপ প্রকাশ করতে হবে; অন্যথায় গোপন রাখার সুনির্দিষ্ট আইনি ও যৌক্তিক কারণ দর্শাতে হবে।




