বিশ্ব যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে মনে হয়, তার কারণ বাস্তবিকই তাই। মধ্যপ্রাচ্যে অন্তহীন যুদ্ধ, নয়া পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নিয়ন্ত্রিত অপ্রমাণিত অস্ত্র মোতায়েনের প্রতিযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ব্যাহত করা শুল্ক ও অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা, এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর প্রতি ক্রমবর্ধমান অশ্রদ্ধা—এসব মিলে বর্তমান সময়টি অভূতপূর্ব বিশৃঙ্খলার। প্রতিটি চ্যালেঞ্জেরই নিজস্ব কারণ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার সমাধানে প্রয়োজন গভীর জ্ঞান। তবে শুধু নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান যথেষ্ট নয়; একটি বৃহত্তর কাঠামোর প্রয়োজন, যা বিশ্বে শান্তি, স্থিতিশীলতা, সহনশীলতা, ন্যায়বিচার ও আনন্দ নিশ্চিত করতে দিকনির্দেশনা দেবে।
এই বিশাল লক্ষ্য পূরণের একটি পথ দেখাতে পারে 'এসএসআরএপি' বা 'অস্ত্র ও বিস্তার দূরীকরণের কৌশলগত ধারণা' (Strategic Concept for the Removal of Arms and Proliferation) নামক একটি উদ্যোগ। এর মৌলিক লক্ষ্য হলো জাতিসংঘের মূল অভীষ্ট বাস্তবায়ন—সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ। এই পদ্ধতি কেবল পারমাণবিক নয়, বরং অ-পারমাণবিক অস্ত্রের ওপরও বিধি-নিষেধ আরোপের কথা বলে। বর্তমান সময়ে এই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য, কেননা অ-পারমাণবিক অস্ত্রের নিখুঁততা ও ধ্বংসক্ষমতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপেক্ষাকৃত সস্তা ও সহজলভ্য প্রযুক্তি, যেমন ড্রোন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সংঘাতকে জিইয়ে রাখতে পারে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন একপ্রকার সাবমেরিন-উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করছে যাতে পরমাণুর বদলে প্রচলিত ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যেহেতু আমেরিকার বাকি সব ক্ষেপণাস্ত্রই পারমাণবিক, তাই লক্ষ্যবস্তু দেশের নেতৃত্ব স্বাভাবিক নিয়মেই ধরে নেবেন যে এটি পরমাণু হামলা। আর তাদের এরূপ ধারণা মোটেও অমূলক নয়, কারণ পারমাণবিক যুগের শুরু থেকে এ ধরনের সমস্ত ক্ষেপণাস্ত্রই পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত থাকত। সেক্ষেত্রে একটি অ-পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্ররর আঘাতও একটি সর্বাত্মক পারমাণবিক যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইরাক, লিবিয়া ও ইরানের মতো পরমাণু উচ্চাভিলাষী দেশগুলোর নেতৃত্ব হত্যা বা সরকার পরিবর্তনে অ-পারমাণবিক অস্ত্র ও যুদ্ধ ব্যবহার করেছে। জর্জ ডব্লিউ বুশের তথাকথিত 'মন্দের অক্ষরেখা'-এ নাম থাকা দেশগুলোর মধ্যে কেবল উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন রক্ষা পেয়েছেন। কারণ তার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, যা দিয়ে তিনি দক্ষিণ কোরিয়া ও তার বাইরে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারেন যদি কোনো বড় আকারের প্রচলিত হামলা তার জীবন বা শাসনকে হুমকির মুখে ফেলে। ফলে, পরমাণু অস্ত্রধারণে সক্ষম দেশগুলোর বিরুদ্ধে সরকার পরিবতনের নীতি অস্ত্র বিস্তারকে নিরুৎসাহিত করার বদলে উল্টো এটিকে উৎসাহই দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষেরা প্রাণ ও শাসন বাঁচানোর নিশ্চয়তা হিসেবেই পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে ঝুঁকছে।
মূল বার্তাটি হলো, একা পারমাণবিক অস্ত্র কমানো শান্তি ও স্থিতিশীলতা বয়ে আনবে না; বরং প্রচলিত অস্ত্রের উৎপাদন ও মোতায়েন নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণও অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। দূরদর্শী এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে নিজের ও নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে অনেক কিছু দাবি করা জরুরি। বৃহৎ লক্ষ্য ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার আবেগীয় শক্তি কখনোই সঞ্চিত হবে না। একইসঙ্গে স্থানীয় পরায় পারিবারিক, বন্ধুত্ব ও সম্প্রদায়ের স্তরে ইতিবাচক কাজের যে বীজ রোপিত হয়েছে, তা যাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিকশিত হতে পারে, সে জন্য ঝুঁকি নিরসনকারী কাঠামো গঠন করাও জরুরি।




