২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করা নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ দীর্ঘ আট বছরেও নিজস্ব স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পায়নি। বর্তমানে ২৫০ শয্যার নেত্রকোনা সদর হাসপাতাল সংলগ্ন অস্থায়ী কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির পাঠদান চলছে। এদিকে, প্রথম দুই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়ে চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করলেও কলেজটির পরিকাঠামোগত দুরবস্থা কাটেনি।

এখন পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে মোট ৩৩৩ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত, যার মধ্যে ছাত্রী ২৩০ ও ছাত্র ১০৩ জন। কলেজটির জন্য অনুমোদিত ১০৩টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৫৩ জন। এই তীব্র শিক্ষকস্বল্পতার কারণে একটি বিভাগের শিক্ষককে প্রায়ই একইসাথে একাধিক ব্যাচের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষা ও হাসপাতাল-কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল গনি জানান, অতীতে একটি বিষয়ের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের অসংখ্য শিক্ষক নিযুক্ত থাকলেও বর্তমানে কমসংখ্যক শিক্ষকই সব দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

শ্রেণিকক্ষ ও আবাসন পরিস্থিতিও সংকটাপন্ন। কর্তৃপক্ষ অস্থায়ীভাবে চারটি একাডেমিক ভবন ব্যবহার করছে, যার সম্মিলিত আয়তন আনুমানিক ১৯ হাজার বর্গফুট। সেখানে লেকচার গ্যালারি রয়েছে চারটি এবং টিউটোরিয়াল কক্ষ পাঁচটি। মাত্র ৪৫০ বর্গফুটের গ্রন্থাগারটিতে একসাথে ২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী বসতে পারে না। শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো স্থায়ী হোস্টেল নেই; ছাত্রীদের একটি অংশ হাসপাতালের কোয়ার্টারে থাকলেও বাকিদের বাইরে ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। ছাত্রদের জন্য ছয়তলা হাসপাতাল ভবনটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ক্লিনিক্যাল বা হাতে-কলমে শিক্ষার সুযোগ সীমাবদ্ধতা। যেহেতু কলেজটির নিজস্ব হাসপাতাল নেই, তাই প্রশিক্ষণ পুরোপুরি জেলা সদর হাসপাতালের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই হাসপাতালেই চিকিৎসকের প্রায় অর্ধেক পদ শূন্য এবং পূর্ণাঙ্গ অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও সিসিইউ এখনো চালু হয়নি। জটিল রে গীদের অনেককেই উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য জেলায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্যময় রোগী ও বিশেষায়িত চিকিৎসা পদ্ধতির অভিজ্ঞতা অর্জন যথেষ্ট ব্যাহত হচ্ছে। এক শিক্ষক মন্তব্য করেন, কেবল পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জন না করলে ভবিষ্যতে রোগীর চিকিৎসার মানে প্রভাব পড়তে পারে।

স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের চেস্টা একাধিকবার নেওয়া হলেও বিভিন্ন জটিলতায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৯ সালে সদর উপজেলার মৌজে-বালি অঞ্চলে জায়গা নির্বাচন ও জরিপ শেষ হয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করলেও তা অনুমোদন পায়নি। পরবর্তী সময়ে নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০০ একর জায়গা থেকে মেডিকেল কলেজের জন্য ৫০ একর জমি বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আপত্তির কারণে এই পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়। ফলে স্থায়ী ক্যাম্পাস ইস্যুটি অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় বাসিন্দা হায়দার জাহান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত দিনেও জায়গা নির্ধারণ, অবকাঠামো স্থাপন ও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে এভাবে মেডিকেল কলেজ চালানো কাঙ্ক্ষিত নয়। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিতে না পারলে অর্ধশিক্ষিত চিকিৎসক তৈরি হবে।’ সর্বশেষ গত ১ জুলাই জেলা প্রেসক্লাবের সামনে স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবিতে একটি মানববন্ধনও অনুষ্ঠিত হয়। অপরদিকে, জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. মো. আনোয়ারুল হক উভয়েই জায়গা সংকট সমাধানে আন্তরিক প্রচেষ্টা চলছে বলে জানান। কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ সাইফুল হাসান বর্তমান বাস্তবতায় যতটুকু সম্পদ আছে তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা বলেছেন।