দেশের মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন না করলেও তাদের কেন্দ্রভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এই বাধ্যবাধকতার কারণে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৪ হাজার কোটি টাকা এবং চলতি অর্থবছরে ৪৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে তার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। এই টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমেছে, যেখানে দেশের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে উৎপাদন চার হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে গেছে। পাশাপাশি পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকায় ৬০০ মেগাওয়াট এবং বড়পুকুরিয়ায় কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশীয় কয়লাভিত্তিক দুটি ইউনিট বন্ধ থাকায় উৎপাদন আরও কমে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পিডিবির তথ্যানুযায়ী, তেলচালিত কেন্দ্রগুলোতে ছয় হাজার মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা থাকলেও এগুলো থেকে উৎপাদনে লোকসান বাড়ে। তাই রাতের বেলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উৎপাদন করেও চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি এতটাই সঙ্কটজনক যে শনিবার গভীর রাতে রেকর্ড ৩,০১৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে, এবং পরদিন রোববার সকালেও ২,৭৮৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এলাকার গ্রামাঞ্চলে ভোগান্তির মাত্রা আরও তীব্র। কুমিল্লার নাঙ্গলকোট, ময়মনসিংহের বিভিন্ন গ্রাম ও দিনাজপুরের খানসামা এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন। ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা চাহিদার বিপরীতে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছেন। ঢাকার সাভার অঞ্চলেও দিনে আটবারের বেশি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম এ প্রসঙ্গে বলেন, গ্যাস সরবরাহ অনেক কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, এর ওপর বিদ্যুৎ-চালিত চুলার ব্যবহার বৃওি এবং বৃষ্টি না হওয়ায় চাহিদা বেড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করেই বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে পরিকল্পনাহীনভাবে অতিরিক্ত কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। ফলে দেড় দশকে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও, কেন্দ্র ভাড়া বেড়েছে ১৬ গুণ। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, “যে অসাধু ব্যবসার কাঠামো তৈরি হয়েছে, তা বহাল রেখে কোনো সংকট সমাধান সম্ভব নয়। দুর্নীতি ও লুটপাটের কাঠামো বদলাতে হবে।” তিনি আরও বলেন, এতে খরচ কমলে মানুষ ন্যায্য দামে সেবা পাবে এবং গ্রাম-শহরের বৈষম্য কমবে।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার ও প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও দিনাজপুর]




