ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলে প্রায় দশ দিন ধরে ভেসে বেড়ানো একটি ছোট রাবারের নৌকায় প্রাণ হারিয়েছেন দশজন। তাঁদের নয়জনই বাংলাদেশি নাগরিক; বাকি একজন সুদানের। জীবিত উদ্ধার হওয়া ২৯ জন বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী বর্তমানে মিসরের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গতকাল রোববার মিসরের কায়রোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এই তথ্য জানিয়েছে।

দূতাবাসের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানব পাচারকারী একটি চক্রের সহায়তায় লিবিয়ার তবরুক এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল নৌকাটি। গন্তব্যস্থল ছিল গ্রিস। নৌকায় আরোহী ছিলেন ৩৮ জন বাংলাদেশি ও চারজন সুদানিসহ মোট ৪২ জন। এটি ছিল একটি রাবার নির্মিত নৌযান, যার চলাচলের জন্য একটি দ্রুতগতির ইঞ্জিন ব্যবহৃত হচ্ছিল। কিন্তু নৌকায় কোনো ধরনের নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না। যাত্রার আগে পাচারকারীরা জানিয়েছিলেন, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা। কিন্তু পথিমধ্যে জ্বালানি ফুরিয়ে যায়। এরপর নৌকাটি পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে ভাসতে থাকে।

অবশেষে প্রায় দশ দিন পর, ১৩ আগস্ট, নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ এলাকার উপকূলে এসে পৌঁছায়। তখন স্থানীয় পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৮ জন গুরুতর অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় ছিলেন। তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় চিকিৎসার জন্য।

ঘটনার খবর পাওয়ার পর দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেন স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন। পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়, তাঁদের তদারকিতে ২৯ জন বাংলাদেশি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। পরবর্তী সময়ে হাসপাতালের একজন কর্মচারীর সহযোগিতায় চিকিৎসাধীন বাংলাদেশি আবদুল করিমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন জাকির হোসেন। আবদুল করিমের দেওয়া বর্ণনায় উঠে আসে যাত্রার ভয়াবহ বিবরণ।

তিনি জানান, ৩ আগস্ট তবরুক বন্দর থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তাঁরা। নৌকায় মোট ৪২ জন ছিলেন। সমুদ্রে ভাসমান থাকার সময় তীব্র গরম, প্রচণ্ড সূর্যের তাপ এবং খাদ্য ও পানির চরম অভাবে যাত্রীরা একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে নয়জন বাংলাদেশি ও একজন সুদানিসহ মোট দশজনের মৃত্যু ঘটে। এক পর্যায়ে মৃতদেহগুলোতে পচন শুরু হলে জীবিত যাত্রীরা সেগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হন। ১০ দিন ধরে এই অবস্থায় ভাসতে ভাসতে ১৩ আগস্ট নৌকাটি মিসরের উপকূলে এসে পৌঁছালে পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে।

দূতাবাস জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকে স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহযোগিতাসহ অন্যান্য সব ধরনের সাহায্যের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মিসরের প্রচলিত আইন অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সুস্থ হয়ে ওঠা বাংলাদেশিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে দূতাবাসের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।