শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার অর্থ যে নিষ্ক্রিয় জীবন নয়, তা নিজের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করছেন টাঙ্গাইলের সখীপুরের বাসিন্দা আতিকুল হক। স্থানীয়ভাবে ‘ছমির স্যার’ নামে পরিচিত এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে কৃষ্ণচূড়ার চারা কিনে এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে রোপণ করে চলেছেন। স্কুল মাঠ, হাসপাতাল প্রাঙ্গণ, মসজিদ-মন্দির, ঈদগাহ কিংবা শ্মশানঘাট—সব জায়গাতেই তাঁর নিখরচায় এই বৃক্ষরোপণের কাজ ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে তিনি এক হাজারেরও বেশি চারা রোপণ করেছেন বলে জানা গেছে।
২০২১ সালে বড়চওনা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর বসে না থেকে মানুষ ও প্রকৃতির কল্যাণে কিছু করার চিন্তা থেকেই এই কাজে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। তাঁর রোপণ করা গাছ এখন সখীপুরের ১০টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়। পাশাপাশি কালিহাতীর পারখী ও নাগবাড়ী, ঘাটাইলের সাগরদীঘি ও ধলাপাড়া ইউনিয়ন এবং ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার কয়েকটি এলাকাতেও তিনি কৃষ্ণচূড়ার চারা পৌঁছে দিয়েছেন।
নিজের এই প্রচেষ্টা সম্পর্কে আতিকুল হক বলেন, কর্মজীবনে শিক্ষকতা করেছেন, তবে অবসর নেওয়ার অর্থ এই নয় যে জীবন এখন কর্মহীন। বিভিন্ন বিদ্যালয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সবুজ, শীতল ও মনোরম করে তুলতে তিনি কৃষ্ণচূড়া রোপণ শুরু করেছেন। ভবিষ্যতেও এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। তিনি আরও বলেন, মানুষ ও সমাজের মঙ্গলের জন্য কিছু করতে পারলে নিজেকে সার্থক মানুষ মনে করবেন। যখন দেখবেন তাঁর লাগানো গাছগুলো বড় হয়েছে এবং গাছের ছায়ায় মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে, তখনই তিনি নিজেকে সফল মনে করবেন।
বৃক্ষরোপণের এই উদ্যোগ স্থানীয় শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। বড়চওনা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আফসারা সাফিয়া সাউদা জানায়, ছমির স্যারের উদ্যোগে সে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত হয়েছে। স্কুলের আঙিনায় লাগানো গাছটি বড় হলে অনেক মানুষ ছায়া পাবে এবং পরিবেশও সুন্দর হবে। সখীপুর সরকারি কলেজ চত্বরে চারা রোপণের সময় তাঁকে সহযোগিতা করেছেন কলেজের অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেনও।
মহানন্দপুর বিজয় স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কামরুল হাসান এই উদ্যোগকে মানবিক কাজ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ছমির স্যারকে অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। সখীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল আলমও তাঁর প্রশংসা করে বলেন, অবসরজীবনেও নিজের অর্থ ও শ্রম দিয়ে বৃক্ষরোপণের এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয় এবং সবার জন্য অনুসরণীয়।
শুধু বৃক্ষরোপণই নয়, লেখালেখি ও বই পড়ার প্রতিও গভীর আগ্রহ রয়েছে ছমির স্যারের। ২০০৮ সালে তাঁর লেখা ‘শ্যামলিমা’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া নিজ বাড়িতে তিনি একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার গড়ে তুলেছেন, যেখানে প্রায় এক হাজার বই রয়েছে। খেলাধুলার সাথেও তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক; ফুটবল, ভলিবল ও কাবাডিতে রেফারির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে সমাজের উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নিয়ে আসছেন। ১৯৯৫ সালে বড়চওনা-কুতুবপুর ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় সাংগঠনিক কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
আতিকুল হকের কাছে বৃক্ষরোপণ কোনো প্রচারণার বিষয় নয়; বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রকৃতি ও মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়াই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে চারা লাগানোর সময় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছ থেকে তিনি সহযোগিতা ও উৎসাহ পান, যা তাঁকে আরও অনুপ্রাণিত করে। তাঁর প্রত্যাশা, তাঁর লাগানো গাছগুলো দেখে আরও মানুষ গাছ লাগাতে উৎসাহিত হোক। তাঁর ভাষায়, একদিন কৃষ্ণচূড়াগাছগুলো বড় হবে, ফুলে ফুলে ভরে উঠবে এবং সেই ছায়ায় বসবে শিক্ষার্থী ও পথচারীরা। তখন তিনি হয়তো থাকবেন না, কিন্তু গাছগুলো থেকে যাবে।




