রাজধানীর গুলশান-বনানী-বারিধারা অঞ্চলের লেকের চারপাশে বিপুল অর্থ ব্যয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ সম্পন্ন হলেও পানির গুণগত মান অত্যন্ত নিম্নমুখী রয়েছে। একদিকে বাঁধানো পাড়, ওয়াকওয়ে ও আলোকসজ্জা চোখে পড়লেও অন্যদিকে কালচে পানি, ভাসমান প্লাস্টিক ও দুর্গন্ধ স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বনানী এলাকার বাসিন্দা মাহফুজুল হক বলেন, পাড়ে ইট-পাথরের কাজ হয়েছে, কিন্তু লেকের পানি নোংরা থাকলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ২০১০ সালে একনেকে অনুমোদিত ৪১০ কোটি টাকার প্রকল্পটি ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায় পিছিয়ে যায়। ২০২৫ সালে সংশোধনী এনে মেয়াদ বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৬ নির্ধারণ করা হয়, যেখানে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫৫ কোটি টাকা। আইএমইডির নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত মে পর্যন্ত প্রকল্পের ৮২ শতাংশ কাজ শেষ হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৫৬ শতাংশ। ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণে ব্যয় হয়েছে ২২৩ কোটি টাকা, আর অবকাঠামো খাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে লেক খননে ৩৯ কোটি, তীর সংরক্ষণে ৮ কোটি, ওয়াকওয়ে নির্মাণে প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, লেকের সঙ্গে সরাসরি পয়োবর্জ্য সংযুক্ত থাকায় পরিবেশগত উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। রাজউকের এক প্রকৌশলী সাবের আহমেদ জানান, লেকের পানির ৮৫ শতাংশ সংযোগ পথ দিয়ে প্রতিনিয়ত পয়োবর্জ্য প্রবেশ করছে। ফলে উন্নয়নকাজের সুফল পুরোপুরি মিলছে না। তিন বছর আগে ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলামের সময় অভিজাত এলাকাগুলোর বাসাবাড়িতে কার্যকর সেপটিক ট্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। ডিএনসিসি, ওয়াসা, রাজউক ও ইউনিসেফের যৌথ রোডম্যাপও বিগত সরকারের সহায়তা না পাওয়ায় অগ্রসর হয়নি। ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর হাসিন আহমেদ জানান, দাশেরকান্দিতে অবস্থিত স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের সক্ষমতা প্রতিদিন ৫০ কোটি লিটার হলেও অসম্পূর্ণ পাইপলাইন নেটওয়ার্কের কারণে তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বৃষ্টির সময় ড্রেনের মাধ্যমে পয়োবর্জ্য লেকে গিয়ে মিশছে। সিটি করপোরেশন ও ওয়াসা পরস্পরকে দোষারোপ করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে সমস্যা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, প্রথম কাজ হওয়া উচিত লেকের সঙ্গে পয়োবর্জ্য ও ড্রেনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং পানি প্রবাহ সচল রাখা। তিনি সতর্ক করে বলেন, অন্যথায় প্রকল্প থাকবে কিন্তু লেক বাঁচবে না। সম্প্রতি ৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পয়োবর্জ্য রোধে কঠোর প্রশাসনিক মনিটরিং ও স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কড়াইল বস্তির বর্জ্য যাতে সরাসরি লেকে না পড়ে, সেজন্যও কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার আলোচনা হয়েছে। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় এই বিনিয়োগের সার্থকতা তখনই অর্জিত হবে যখন পানির মান ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে লেকটিকে আদর্শ নগর বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব হবে।