প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও খননকাজ কয়েক দশক ধরে বন্ধ থাকায় সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর উপজেলার একটি শতবর্ষী সরকারি পুকুরের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। মধ্যনগর বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত পুকুরটি এখন পুরোপুরি আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে, যার ফলে বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দিনাতিপাত করছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমেন্দ্র চন্দ্র তালুকদারের বরাতে জানা যায়, পুকুরে জমা ময়লার পচা দুর্গন্ধে শিক্ষার্থীরা চরম অস্বস্তিতে রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে স্প্রে ব্যবহার করলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। দুর্গন্ধরোধে প্রায় দুই মাস আগে বিদ্যালয়ের পাশে জালের বেড়া নির্মাণ করা হয়, যাতে কেউ আবর্জনা ফেলতে না পারে।

ইতিহাস সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় ১১১ বছর আগে, ১৯১৫ সালের দিকে, তৎকালীন গৌরীপুরের জমিদার বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে এই পুকুরটি খনন করা হয়। শুরুতে এর আয়তন ছিল ১ একর ৯৬ শতক। কিন্তু কিয়দংশ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং সরকারি নির্মাণকাজের দরুন বর্তমানে এর আয়তন সংকুচিত হয়ে মাত্র ৮৯ শতকে দাঁড়িয়েছে। খননের পর মধ্যনগর বাজার উন্নয়ন কমিটি কয়েকবার সংস্কার করলেও, বিগত ৩৫ থেকে ৪০ বছর ধরে পুকুরটি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে অবৈধ দখলের কারণে। পুকুরের আশপাশের বিরাট অংশে স্থানীয় বাসিন্দারা বসতবাড়ি ও শৌচাগার নির্মাণ করে দখল করে নিয়েছেন। ছয় বছর আগে ধর্মপাশা উপজেলা প্রশাসন এই অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করলেও, মাত্র তিন-চার বছরের মধ্যেই পুকুরের কিছু অংশ আবারও দখল হয়ে গেছে। মধ্যনগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার এই দখলের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মোট ৮৯ শতক জায়গার প্রায় ৪০ শতাংশই এখন অবৈধ দখলে। তিনি আরও বলেন যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে অবহিত রয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গিয়েছে, পুকুরের উত্তর ও পশ্চিম পাশ জুড়ে ময়লার স্তূপ। এর চারপাশ ঘিরে এখন গড়ে উঠেছে বিভিন্ন বসতবাড়ি ও প্রতিষ্ঠান। সংস্কার কাজ বন্ধ থাকার কারণে পুকুরে কচু, আগাছা এবং কিছু জায়গায় কর্দমাক্ত পানি জমে আছে। এলাকার এক বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক চিত্তরঞ্জন তালুকদার (৭০), এই পুকুরকে ঘিরে তার পুরোনো স্মৃতির কথা স্মরণ করে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রশাসন উচ্ছেদ করলেও তদারকির অভাবে পুকুরটি আবারও পুরনো অবস্থায় ফিরে গেছে। এটিকে দখলমুক্ত করে আগের চেহারায় ফিরিয়ে আনতে এবং সৌন্দর্যবর্ধনে কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই বলে তিনি অভিযোগ তোলেন। তিনি দ্রুত পুকুরটি খনন ও সংস্কারের জোর দাবি জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মধ্যনগর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অতিরিক্ত দায়িত্বরত ধর্মপাশা উপজেলার ইউএনও জনি রায় বলেন, তিনি সম্প্রতি এই উপজেলার দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, ঐতিহাসিক এই পুকুর থেকে দখলমুক্ত করা এবং খনন ও সংস্কারের জন্য অতি শীঘ্রই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।