ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যসেবা আরও ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, চিকিৎসকের চেয়ে সাধারণ মানুষ অনেক সময় ইমাম বা ধর্মীয় গুরুর কথাকে বেশি গুরুত্ব দেন। রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বৃহস্পতিবার ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রিভেনশন সামিট ২০২৬’ শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই মতামত প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। দিনব্যাপী এই সম্মেলনে একটি গোলটেবিল বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনের পরিসমাপ্তি ঘটে ‘ফেইথ বেজড প্রিভেনশন’ বা বিশ্বাসভিত্তিক প্রতিরোধ নামক ঢাকা ঘোষণার মাধ্যমে। ঘোষণাপত্রে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্যোগের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা এবং স্থানীয় কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
সম্মেলনে বক্তারা উল্লেখ করেন, ধর্মীয় নেতারা যদি মানুষকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতে এবং নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে উৎসাহিত করেন, তাহলে তা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। এছাড়া অনুষ্ঠানে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারকরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এবং ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী ও ধর্মীয় নেতারা এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।
সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাডাসের গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ সেন্টারের মাধ্যমে পরিচালিত এক ট্রায়ালে ‘ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ’ মডেলের কার্যকারিতা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। আজাদ খান জানান, গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করায় মানুষের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। তিনি আরও বলেন, এই মডেলটিকে কাজে লাগানো গেলে সারা দেশে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন জানান, বর্তমানে ১০০টি মসজিদে ইমামদের মাধ্যমে ডায়াবেটিস সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইমাম ও একজন নারীকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তার মতে, দেশের বিপুল সংখ্যক মসজিদে এই কার্যক্রম চালু করা গেলে খুতবার মাধ্যমে একসঙ্গে কোটি মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছানো সম্ভব হবে। এর ফলে রোগটি আগে শনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) সভাপতি অধ্যাপক পিটার শোয়ার্জ বলেন, ডায়াবেটিস প্রতিরোধে বাংলাদেশের এই বিশ্বাসভিত্তিক উদ্যোগ বিশ্বে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। তার ভাষায়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর এই মডেলটি বাস্তবায়নযোগ্য এবং টেকসই। তিনি আরও বলেন, অনেক দেশে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের পরিকল্পনা থাকলেও সেগুলো বাস্তবে কার্যকর হয় না। তিনি বাংলাদেশের এই উদ্যোগকে বিশ্বব্যাপী অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে তুলে ধরবেন এবং অন্য দেশগুলোকে তা গ্রহণে উৎসাহিত করবেন।
বিশ্ব ডায়াবেটিস ফাউন্ডেশনের (ডব্লিউডিএফ) বোর্ড চেয়ার সোবিয়া আকরাম বলেন, ‘ঢাকা ঘোষণা’ ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আগেই রোগ শনাক্ত করা এবং অনেক মানুষকে ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব। তিনি বাংলাদেশের এই মডেল অন্য দেশেও ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন ডায়াবেটিস ইন এশিয়া স্টাডি গ্রুপের (ডিএএসজি) সভাপতি আবদুল বাসিত এবং ওআইসি-কমস্টেকের কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক এম ইকবাল চৌধুরী। দিনব্যাপী সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদসহ বাডাসের শীর্ষ নেতারা।



