বৈশ্বিক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও পড়েছে। কোভিড-১৯ বৈশ্বিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা উন্মোচন করেছে, ইউক্রেন যুদ্ধ জ্বালানি ও সরবরাহশৃঙ্খলের নিরাপত্তাকে নতুন করে গুরুত্ব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার রূপ বদলে দিয়েছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আর কেবল রাজনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্থনৈতিক রূপান্তর, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সরবরাহশৃঙ্খলে অংশগ্রহণের একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও পরিবর্তিত হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রয়োজনীয়তা নতুন নীতিগত প্রশ্ন তুলেছে। এর উত্তর খুঁজতে হবে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতির পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতিতেও। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এখন কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা নয়; বরং বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তোলা যা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে সহায়তা করবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাফল্য এখন যৌথ বিবৃতি বা সফরের সংখ্যায় নয়, বরং তা দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে তার ওপর নির্ভর করে।
এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশকে কেবল সহায়তা গ্রহণকারী দেশ নয়, সক্ষম অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। উন্নয়ন সহযোগিতার পরিবর্তে গুরুত্ব পাবে বিনিয়োগ, যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি স্থানান্তর। কূটনীতিকদেরও এই নতুন বাস্তবতার উপযোগী আলোচনার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। অর্থনৈতিক শক্তি আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়ায়; আবার কার্যকর কূটনীতি নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে। ভবিষ্যতের অংশীদারত্ব শুধু বাংলাদেশের প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করবে না; বাংলাদেশ কী মূল্য সংযোজন করতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে। ভৌগোলিক অবস্থান, ক্রমবর্ধমান শিল্পভিত্তি, নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা ও দক্ষ জনশক্তি—এসবই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এগুলো কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে পারলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।
বাংলাদেশের সামনে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে: বিশ্বাসযোগ্যতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বাধীনতা। নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও চুক্তি বাস্তবায়নের সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা তৈরি করে। বিনিয়োগকারী ও কৌশলগত সহযোগীরা এমন রাষ্ট্রের সঙ্গেই দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলে, যার নীতি স্থিতিশীল এবং প্রতিষ্ঠান কার্যকর। এলডিসি-উত্তর বাংলাদেশে প্রতিযোগিতাই প্রধান নিয়ামক হবে। উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি না করলে আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হবে। বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে, বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও প্রভাব ফেলবে। কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে; আবার অপ্রয়োজনীয় ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়াও জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয়। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ঐতিহ্য সবার সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার। সেই নীতির প্রাসঙ্গিকতা এখনও অটুট রয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য-ব্যর্থতা শুধু আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর নির্ভর করে না; বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতার আন্তর্জাতিক প্রতিফলন। অর্থনীতি প্রতিযোগিতামূলক না হলে, প্রতিষ্ঠান কার্যকর না হলে দক্ষ কূটনীতি দীর্ঘ মেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। বিপরীতে, আত্মবিশ্বাসী ও সুশাসিত রাষ্ট্র তুলনামূলক সীমিত সম্পদ নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারে। তাই পররাষ্ট্রনীতিকে শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাণিজ্য, অর্থনীতি, শিক্ষা, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রের অগ্রগতিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শক্তি নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হলেও সম্ভাবনা নিজে থেকেই সাফল্যে রূপ নেয় না। তার জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, নীতির ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কূটনীতি এই প্রচেষ্টাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে এগিয়ে নিতে পারে, কিন্তু তার বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্ন হলো: রাষ্ট্র হিসেবে কতটা বিশ্বাসযোগ্যতা, সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নির্ধারণ ও রক্ষা করা যায়। সেটি সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কও আরও ফলপ্রসূ হবে। পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অন্যদের অবস্থান নির্ধারণ করা নয়; নিজের অবস্থান সুস্পষ্ট করা।
এম হুমায়ুন কবির: বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত।



