রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত জুলাই মাসে দেশে মোট ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪১৬ জন ব্যক্তি, যার মধ্যে ৫৭ জন নারী ও ৪৮ জন শিশু রয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৬২৯ জন। মৃতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যকই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন—১৩৮ জন, যা মোট নিহতের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। এর পরেই রয়েছে থ্রি-হুইলার যাত্রী, যাদের মধ্যে ৯৪ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী, বাসযাত্রী ও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-পিকআপের আরোহীরাও প্রাণ হারিয়েছেন।

দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সকালের সময় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। দিনের মোট দুর্ঘটনার ২৮ দশমিক ৮২ শতাংশই ঘটেছে এই সময়ে। রাতে এই হার ১৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ, দুপুরে ১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং বিকেলে ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। সন্ধ্যা ও ভোরের সময় দুর্ঘটনার তুলনামূলকভাবে কম হার দেখা গেছে।

সড়ক দুর্ঘটনার স্থান বিবেচনায় জাতীয় মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি ১৬৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। আঞ্চলিক সড়কে ১৫৫টি, শহরের সড়কে ৬৬টি, গ্রামীণ সড়কে ৬১টি এবং অন্যান্য স্থানে আরও ৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৩৩টি দুর্ঘটনায় ১২৫ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনার হারও উল্লেখযোগ্য, অন্যদিকে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ২৮টি দুর্ঘটনায় ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় জুলাই মাসে ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৫৩ জন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন। এছাড়া রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মী, ব্যাংক-বিমার কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিক্রয় প্রতিনিধি, শিক্ষক ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

দুর্ঘটনার ধরন নিয়ে সংগঠনটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ১৬৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ১২৩টি, পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১০৮টি এবং পেছন থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫৪টি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন তাদের বিবৃতিতে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও বেপরোয়া মানসিকতাকে চিহ্নিত করেছে। তারা আরও বলেছে, চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বেতন না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে। দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকেও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।

দুর্ঘটনা কমাতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কার, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার এবং যানবাহনে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। দক্ষ চালক তৈরি, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ এবং রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগেরও সুপারিশ করা হয়েছে। সংগঠনটির মতে, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে নীতিমালা ও অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং এ জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও জরুরি।