পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের চাঁন্দাই গ্রামে এখন বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। গ্রামবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হচ্ছে বিশাল আকৃতির একটি বাইচের নৌকা, যার দৈর্ঘ্য ১২৫ ফুট। 'চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস' নামের এই নৌকাটি তৈরিতে খরচ ধরা হচ্ছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। গ্রামের ছোট্ট বাজারের পাশের মাঠে ত্রিপল টাঙিয়ে বিশাল প্যান্ডেল তৈরি করা হয়েছে, যেখানে দিনরাত চলছে নৌকা তৈরির কাজ। কারিগরেরা কাঠে পেরেক ঠুকছেন, আর মাঝে মাঝে জারি-সারি গানের সুরে উৎসাহ যোগাচ্ছেন উপস্থিত মানুষজন।
একতার প্রতীক হিসেবে নৌকার নামের সঙ্গে 'জনতা' শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। তাদের মতে, গ্রামের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই এই নৌকা বানানো হচ্ছে। নৌকাবাইচের সাথে চাঁন্দাই গ্রামের সম্পর্ক বহু প্রাচীন। প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, ১৯৮৮ সালে প্রথম বাইচের নৌকা তৈরি করেছিলেন তারা। কৃষক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ নিয়ে গড়ে ওঠে বাইচালদের দল। এরপর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য পেতে থাকে তারা। বুড়িগঙ্গা নদীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় দুইবার প্রথম হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ১০টি দ্বিতীয় পুরস্কার অর্জন করেছে এই দল। ফলে নৌকাবাইচ এখন চাঁন্দাইবাসীর কাছে ঐতিহ্য ও আবেগের অংশ হয়ে উঠেছে।
৮০ বছর বয়সী গোলজার হোসেন একসময় ছিলেন এই গ্রামের সফল বাইচাল। যৌবনে নৌকায় বসে বইঠা টেনেছেন তিনি। বয়সের কারণে এখন আর বাইচে অংশ নিতে না পারলেও প্রতি দিন নৌকা তৈরির স্থানে এসে কিছুক্ষণ বসে থাকেন। অপরদিকে ৬২ বছর বয়সী নায়েব আলী জানান, বাপ-চাচাদের হাত ধরে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য এখন ছেলেদের মধ্যে চলে এসেছে, যা দেখে তিনি আনন্দিত।
প্রায় ৫০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কারিগর দুলাল চন্দ্র সূত্রধর (৭০) জানান, বাবার কাছেই তিনি নৌকা তৈরির কাজ শিখেছেন। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে প্রায় ৭০টি বাইচের নৌকা তৈরি করেছেন। সাধারণ নৌকার চেয়ে বাইচের নৌকা তৈরি বেশি কঠিন বলে জানান তিনি। শাল, গর্জন ও সেগুন কাঠ ব্যবহার করে আগুনে পুড়িয়ে কাঠ বাঁকানো হয়, এরপর লোহার পাত ও পেরেক দিয়ে জোড়া লাগানো হয়। প্রতিটি জায়গার মাপ ঠিক রেখে তৈরি করতে দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগে এবং নৌকার আকার অনুযায়ী দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত মজুরি নেন কারিগরেরা।
নৌকা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও ইউপি সদস্য আসাদুল ইসলাম বলেন, গ্রামের ঐতিহ্য ধরে রাখতে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ঐক্যবদ্ধ। ইতোমধ্যে এই গ্রাম থেকে তিনটি নৌকা তৈরি হয়েছে, এখন চতুর্থটি নির্মাণাধীন। নৌকা তৈরিতে গ্রামের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্থ সহযোগিতা করেছেন। এতে পুরো গ্রামে উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
নৌকা তৈরির পাশাপাশি নবীন ও অভিজ্ঞদের নিয়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে বাইচালদের দল। নির্মাণ শেষ হলে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর হবে পরীক্ষামূলক বাইচ। নৌকাটির মাঝি আবু সাঈদ জানান, নৌকা তৈরি হলেই অনুশীলন শুরু হবে এবং লক্ষ্য থাকবে দেশের বিভিন্ন স্থানের বাইচে অংশ নেওয়া। আয়োজকরা আশা করছেন, আগামী ১৭-১৮ দিনের মধ্যে নৌকাটির নির্মাণকাজ শেষ হবে।
তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন আয়োজকরা। নৌকা পরিচালনা কমিটির সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, গ্রামের মানুষের ঐক্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে নৌকার মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। কৃষিজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এই উদ্যোগকে সরকার সহযোগিতা করলে ঐতিহ্য আরও ভালোভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো।




