ফুটবলকে চরম অনিশ্চয়তার খেলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাঠে মুহূর্তের মধ্যে কী ঘটবে, তা সম্পূর্ণ নিখুঁতভাবে পূর্বাভাস দেওয়া কার্যত অসম্ভব। সম্প্রতি ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে এমনই চমক দেখা গেছে, যেখানে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করেছে, অথবা র‌্যাংকিংয়ের ৬৭ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে ফেভারিট স্পেনকে গোলশূন্য ড্র করতে বাধ্য করেছে। একটি দলের জয়ের পেছনে কেবল পায়ের জাদু ও কোচের নিখুঁত ট্যাকটিকসই যথেষ্ট নয়, বরং আসল রহস্য নিহিত থাকে তাঁদের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালীতে।

খেলাধুলার বিজ্ঞানের মধ্যে স্পোর্টস সাইকোলজি সবচেয়ে চমকপ্রদ একটি শাখা। তীব্র কোলাহল ও উত্তেজনার মধ্যেও বিশ্বের সেরা তারকারা এমন পাঁচটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল প্রয়োগ করেন, যা তাঁদের অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে।

প্রথম কৌশলটি হলো অ্যাটেনশনাল ফিটনেস বা মনোযোগের সুপার-ফিটনেস। আর্লিং হলান্ড বা কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো দুর্দান্ত স্ট্রাইকাররা যখন বল নিয়ে গোলপোস্টের দিকে ধাবিত হন, তখন গ্যালারির লাখো দর্শকের চিৎকার ও প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বাধা—কোনো কিছুই তাঁদের বিচলিত করতে পারে না। চাপের মুখে সাধারণ মানুষের মনোযোগ যেখানে ভেঙে পড়ে, এই ফুটবলাররা সেখানে স্নায়ু নিয়ন্ত্রণে রেখে ঠিক সময়ে একদম নিখুঁত স্থানে অবস্থান নেন। তাঁরা একই সঙ্গে মাঠের আশপাশের অসংখ্য বিষয় মনে রাখেন এবং সুযোগ আসামাত্রই বাজপাখির মতো তা কাজে লাগান।

দ্বিতীয় কৌশলটি প্রতিপক্ষের ছন্দ ও পরিকল্পনা বিপর্যস্ত করে দেওয়ার ক্ষমতা। জয়ের জন্য তারকারা মাঠে বুদ্ধিমত্তার সাথে কিছু কৌশলী ফাউল করেন, এমন আকস্মিক গতিতে পাল্টা আক্রমণ চালান যাতে প্রতিপক্ষ সামলে ওঠার সময়ই না পায়, অথবা উচ্চচাপ প্রয়োগ করে প্রতিপক্ষকে ভুল করতে বাধ্য করেন। এই মনস্তাত্ত্বিক আঘাত সামলাতে না পেরে বহু শক্তিশালী দলও ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে।

তৃতীয় কৌশলটি হলো নিয়ন্ত্রিত মাইন্ড-ওয়ান্ডারিং বা মনকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ঘুরে বেড়াতে দেওয়া। আর্জেন্টাইন জাদুকর লিওনেল মেসির খেলায় দেখা যায়, ম্যাচের একটি বড় অংশ তিনি কেবল হেঁটে বেড়ান, যেন তাঁর কোনো তাড়া নেই বা খেলা নিয়ে কোনো ভাবনাই নেই। মেসির দৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা এক অদ্ভুত তথ্য আবিষ্কার করেছেন। দেখা গেছে, মেসি বেশিরভাগ সময় বলের দিকে তাকানই না। পুরো ৯০ মিনিট একটানা তীব্র মনোযোগ ধরে রাখা মানুষের মস্তিষ্কের পক্ষে সম্ভব নয়। মেসি যখন বলের বাইরে তাকান, তখন তাঁর মস্তিষ্ক ভিন্ন উপায়ে তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে পুরো মাঠের একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে ফেলে। আর যখনই সুযোগ আসে, নিমেষে তিনি খেলায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং প্রতিপক্ষকে অনায়াসে পরাস্ত করেন।

চতুর্থ কৌশলটি ফুটবলারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি রেফারিদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। খেলোয়াড়দের আঘাতের ভান, অফসাইডের সূক্ষ্ম বিচার এবং পেনাল্টির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় রেফারিদের প্রচণ্ড মানসিক চাপ মোকাবিলা করতে হয়। বিশেষত ২০২৬ বিশ্বকাপে রেফারিদের মাথায় ক্যামেরা থাকায় বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শক সরাসরি তাঁদের ভিউ থেকে খেলা পর্যবেক্ষণ করছে। এই পর্বতসমান চাপ সহ্য করে শান্ত মস্তিষ্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য রেফারিদের বিশেষ ধরণের মানসিক দৃঢ়তার প্রয়োজন হয়, যা এক ধরনের লোহার মতো শক্ত মন।

সর্বশেষ কৌশলটি হলো মাঠের ভেতরের সৃজনশীলতা। বিজ্ঞান অনুযায়ী, সৃজনশীলতা কেবল কবি বা শিল্পীদের জন্য সংরক্ষিত নয়, ফুটবলারদের কাছেও তা সমান গুরুত্বপূর্ণ। জটিল পরিস্থিতি থেকে আকস্মিকভাবে এক অভিনব উপায়ে বল বের করে আনাকে ডাইভারজেন্ট থিংকিং বা ভিন্নধর্মী চিন্তা বলা হয়। কেভিন ডি ব্রুইনা অথবা লুকা মদরিচের মতো মিডফিল্ডাররা সাধারণের চেয়ে তিন-চার চাল সামনে চিন্তা করতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মরিসিও পচেত্তিনো একবার মন্তব্য করেছিলেন, ‘শিশুদের মতো মন খুলে খেলো’। অর্থাৎ, যখন মস্তিষ্কে কোনো কাঠিন্য থাকে না, তখনই তা সবচেয়ে সেরা ও চোখ ধাঁধানো সৃজনশীল ফুটবল উপহার দিতে পারে।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান