মঙ্গলবার রাতে বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে দুই প্রতিবেশী ফ্রান্স ও স্পেন। ফ্রান্স টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে পা রাখার স্বপ্ন দেখছে, অন্যদিকে স্পেনের সামনে দ্বিতীয়বার শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে খেলার সুযোগ। এই মহারণের উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। মাঠের লড়াই শুরুর আগে চলুন ফিরে দেখা যাক দুই দলের পাঁচটি কিংবদন্তিতুল্য দ্বৈরথের ইতিহাস।

গল্পের সূচনা ১৯৮৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল দিয়ে। প্যারিসের পার্ক দে প্রিন্সেসে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচ ছিল বড় কোনো টুর্নামেন্টের মঞ্চে ফ্রান্স ও স্পেনের প্রথম সংঘর্ষ। ফরাসি কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনির অসাধারণ পারফরম্যান্সে ভর করে সেবার প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি ঘরে তোলে ফ্রান্স। ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়েছিল প্লাতিনির নেওয়া এক ফ্রি-কিকে। স্প্যানিশ গোলরক্ষক লুইস আরকোনাদা বলটি প্রায় তালুবন্দী করে ফেলেছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে বল তার হাত ফসকে গোললাইন অতিক্রম করে। ওই আসরে এটি ছিল প্লাতিনির নবম গোল। খেলার শেষ পর্বে ব্রুনো বেলোন আরেকটি গোল করলে ফ্রান্স ২-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে।

২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে এখন পর্যন্ত একমাত্রবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল দল দুটি। হ্যানোভারের ওই লড়াইয়ের আগে গ্রুপের তিন ম্যাচেই জিতে দুরন্ত ছন্দে ছিল স্পেন। বিপরীতে, সুইজারল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ড্র করে কোনোরকমে নকআউট পর্বে পৌঁছায় ফ্রান্স। খেলায় ডেভিড ভিয়ার পেনাল্টি থেকে স্পেন প্রথমে লিড নেয়, কিন্তু বিরতির পূর্বে ফ্রাঙ্ক রিবেরি ফরাসিদের সমতায় ফেরান। শেষ দিকে প্যাট্রিক ভিয়েরা আবারও ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন এবং যোগ করা সময়ে জিনেদিন জিদানের গোল স্পেনের বিদায় নিশ্চিত করে ৩-১ গোলের জয় এনে দেয়। সেই আসরের ফাইনালে ইতালির কাছে হেরে রানার্সআপ হয়েছিল ফ্রান্স।

আধুনিক যুগে দুই প্রতিপক্ষের দ্বৈরথ নতুন এক মাত্রা লাভ করে ২০২১ সালের উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে। মিলানের সান সিরোতে করোনাকালীন দর্শক বিধিনিষেধের ছায়ায় অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে লুইস এনরিকের স্পেন প্রথমে মিকেল ওইয়ারসাবালের গোলে অগ্রসর হয়। কিন্তু পরে করিম বেনজেমা ও কিলিয়ান এমবাপ্পের লক্ষ্যভেদে শেষ হাসি হাসে ফ্রান্স, ২-১ গোলের জয়ে শিরোপা ওঠে তাদের হাতে।

২০২৪ ইউরোর সেমিফাইনাল মিউনিখে অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানের গোল-উৎসব করা ফ্রান্সের সঙ্গে সেই আসরের দলটির বিস্তর ফারাক ছিল; সেবার তারা কোনো ওপেন প্লে গোল না করেই সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল। কোলো মুয়ানির গোলে ফ্রান্স শুরুতেই এগিয়ে যায়, কিন্তু মঞ্চের পুরো আলো কেড়ে নেন মাত্র ১৬ বছর ১১ মাস বয়সী এক বিস্ময়-বালক লামিনে ইয়ামাল। নিজের ১৭তম জন্মদিনের মাত্র চার দিন আগে এক অপূর্ব গোলে স্পেনকে সমতায় ফেরান তিনি। অচিরেই দানি ওলমো জয়সূচক গোলটি করে ফ্রান্সকে আসর থেকে বিদায় করেন। পরবর্তীতে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন এবং ইয়ামাল টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পান।

সর্বশেষ, গত বছর জুনে স্টুটগার্টে নেশনস লিগের সেমিফাইনালে এক অবিশ্বাস্য গোলোৎসবের সাক্ষী হয় ফুটবল বিশ্ব। দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর পরপরই নিকো উইলিয়ামস, মিকেল মেরিনো, পেদ্রি ও পেনাল্টি থেকে লামিনে ইয়ামালের গোলে স্পেন ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। এমবাপ্পে পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও ইয়ামাল দ্রুত আরেকটি গোল করে ব্যবধান ৫-১-এ নিয়ে যান। কিন্তু ম্যাচের অন্তিমলগ্নে ফ্রান্স অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। রায়ান শেরকি, কোলো মুয়ানি ও স্পেনের দানি ভিভিয়ানের আত্মঘাতী গোলে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৫-৪। শেষপর্যন্ত রুদ্ধশ্বাস লড়াইটি ৫-৪ গোলে জিতে নেয় স্পেন, যদিও ফাইনালে তারা পর্তুগালের কাছে পেনাল্টিতে হেরে যায়। এছাড়া, ২০২৪ অলিম্পিকের স্বর্ণপদক নির্ধারণী ম্যাচেও স্পেন ৫-৩ ব্যবধানে ফ্রান্সকে পরাস্ত করেছিল এবং সেই অলিম্পিক দলের একাধিক তারকা এবারের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালেও দেখা দিতে চলেছেন।